দেবীদ্বারের রণাঙ্গণ ও ১৯৭১ সালের গণহত্যা
দেবীদ্বারের রণাঙ্গণ ও ১৯৭১ সালের গণহত্যা: এক স্মৃতিমূলক প্রতিবেদন
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ দিনগুলিতে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা ছিল হানাদার বাহিনীর প্রতি বাঙালির সাহসী প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র। স্বাধীনতার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ৩১ মার্চ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থেকে আগত ১৫ সদস্যের সু-সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়ক ধরে ভিংলাবাড়িতে জনতার হাতে প্রথমবার অবরুদ্ধ হয়। স্থানীয় মানুষের হাতে প্রথম শহীদ হন আবুল কাসেম। ভিংলাবাড়ি থেকে জাফরগঞ্জ শ্রীপুরপাড় জামে মসজিদ পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার ধরে চলা প্রতিরোধ যুদ্ধে ৩৩ বাঙালি শহীদ হন। এই দিনটি বাংলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নিরস্ত্র বাঙালির সাহসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
১৪ এপ্রিল বরকামতা গ্রামে পাক বাহিনী হামলার সংবাদে কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল হাফেজের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ হাজার বাঙালি মাত্র দুটি রাইফেল ও লাঠি নিয়ে শত্রুসেনাদের মোকাবিলা করে। যদিও পাক বাহিনী কিছু সময়ের জন্য গ্রামে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়, রাতেই তারা ফিরে এসে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারীদের উপর নৃশংসতা চালায়। ২৪ জুন মুরাদনগরের বাখরাবাদে পাক সেনাদের ভয়াবহ গণহত্যায় ২৪০ নিরীহ বাঙালি নিহত হন। দেবীদ্বারের বারুর, ধামতী ও ভূষণা গ্রামেও এ ধরনের হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। ৬ সেপ্টেম্বর বারুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে; ছয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
দেবীদ্বারের মহেশপুর গ্রামে ১৭ সেপ্টেম্বর সংঘটিত গণহত্যা বাঙালি ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। পাক সেনা ও রাজাকাররা গ্রামের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় এবং নারী ও শিশুর উপর নৃশংসতা চালায়। একই সময় ৩ নভেম্বর রামপুর অঞ্চলে ৮ জন শহীদ ও বহু মানুষ গুম হয়। এই গণহত্যাগুলো দেবীদ্বারের সাধারণ মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ এবং অসীম প্রতিরোধের স্মারক হয়ে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
৩ ও ৪ ডিসেম্বর দেবীদ্বারের কৌশলগত মুক্তি অভিযান শুরু হয়। কোম্পানীগঞ্জ সেতু মাইন বিস্ফোরণে ধ্বংস করা হয়। ৪ ডিসেম্বর উপজেলার বিভিন্ন গ্রুপ হানাদার মুক্ত করে। জয়বাংলা স্লোগানে পুরো উপজেলা উল্লাসে মেতে ওঠে। ৭ ও ৮ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযান কুমিল্লাকে ঘিরে ফেলে এবং ৮ ডিসেম্বর চূড়ান্তভাবে মুক্ত হয়।
দেবীদ্বারের রণাঙ্গণ ও গণহত্যার ইতিহাস শেখায়, সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, কৃষক ও শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে নিরস্ত্র থাকা সত্ত্বেও হানাদারদের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে লড়েছে। স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণের মাধ্যমে এই ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা আগামী প্রজন্মকে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও বীরত্বের গল্প জানাতে সাহায্য করবে।
লেখক: মমিনুল ইসলাম মোল্লা, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, কুমিল্লা।











No comments