সন্তানের ইসলামি নাম রাখা মুসলিম পিতার কর্তব্য



মমিনুল ইসলাম মোল্লা
বর্তমানে আমাদের  দেশে এমন কিছু নাম দেখা যায় যেগুলো শুনলে বুঝা মুশকিল সে ছেলে নাকি মেয়ে, হিন্দু নাকি মুসলমান ? আমরা জানি নামটাই মানুষের প্রথম পরিচয়। কেউ কেউ বলেন  “নামের বড়াই করেনা , নাম দিয়ে কি হয় ?”  যদিও বড়াই করার কিছু নেই , তবুই নামের মাঝেই আমার প্রথম পরিচয়। আবুল হোসেন চৌধুরী, নারায়ন চক্রবর্তী, কিংবা মাইকেল কলিন্স এর নাম শুনলেই আমরা বুঝতে পারি কে কোন ধর্মের লোক ?  নামটা পোশাকের মতো সহজে পরিবর্তনযোগ্য না হওয়ায় পিতা-মাতার উচিত তাদের উপর আরোপিত সন্তানের প্রথম হক আদায় করা। আর তা অবশ্যই হতে হবে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে। ইদানিংকালে বাংলাদেশে বাংলা নাম রাখার ব্যাপারে অনেকেই বিশেষভাবে উৎসাহী । কেউ যদি রাতে জন্ম নেয় তাহলে তার নাম হয়তো রাখা হলো রজনী,  অথবা নিশা, দিনে জন্ম নিলে দিবা, শীতের সময় নাম রাখা হয় কুয়াশা, বৃষিটর কারণে নাম পাল্টে হয়ে যায় বৃষ্টি, অথবা বন্যার বছর জন্ম নেয়া অধিকাংশ শিশুর নাম বন্যা রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এধরণের নাম ইসলাম সমর্থন করে কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়। তবে মুসলিম ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে বাংলা নাম রাখতে বাধা নেই। কিন্তু অনন্ত, চিরঞ্জীব, অসীম, কিংবা মৃত্যুঞ্জয় রাখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্কদের নাম যদি কুরআন- হাদিস বিরোধী হয়ে থাকে তাহলে সেটি বদলে নেয়া যেতে পারে। কেউ কেউ বলেন হযরত উমর, হযরত আলী এরা কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করারা পর নাম পরিবর্তন কররেননি। তারা তদের পুর্বের নামেই পরিচিতি লাভ করেন। একথাও ঠিক যে আমাদের প্রিয় নবি অনেক সাহাবি এমনকি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীদের নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। হাদিসে এসেছে, মহিলা সাহাবি যয়নব ( রাঃ)  এর নাম ছিল বাররাহ  ( পূর্ণবতী ) । তা শুনে রসুল সাঃ বলেন, তুমি কি আত্মস্তুতি করছো ? তখন রাসুল সাঃ তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন “ যয়নব”।  (ইবনে মাজাহ ৩৭৩২ )
আমরা আমাদেও সন্তানদের পুরো নামে ডাকবো। বর্তমানে আমাদের দেশে ডাক নামের যে প্রচলন ঘটেছে তা শরিয়তসম্মত নয়। কেউ যদি আমার নাম বিকৃত করে ডাকে তাকে সবিনয়ে বলতে হবে ভাই অপনি ইচ্ছে করে গুনাহের ভাগী হচ্ছেন কেন ?  কেননা পুরো নাম ধরে না ডাকলে নামের অর্থ পাল্টে যায়। যেমন কেউ যদি তার সন্তানের নাম আব্দুর রহিম বলে ডাকে তাহলে তার অর্থ হয় আল্লাহর গোলাম যেহেতু আল্লাহর আরেক নাম রাহমানুর রাহীম। এখন আমি যদি তাকে শুধু রহিম বলে তাকে ডাকি তাহলে অর্থ দাঁড়ায় শুধু আল্লাহ । কোন মানুষকে আমরা আল্লাহ বলে ডাকতে পারিনা ( নাউজু বিল্লাহ মিন জালেক )। বুখারি শরিফে বর্ণিত রয়েছে, মুমিনের হক অপর মুমিনের ওপর এই যে তাকে অধিক পছন্দনীয় নাম ও পদবী সহকারে ডাকবে। সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই হাদিসকে পাধান্য দিতে হবে। মুসলিম শরিফের হাদিসে এসেছে, আল্লাহর পছন্দের ও সর্বোত্তম নাম হচ্ছে আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। অন্য হাদিসে এসছে সবচেয়ে সত্য নাম হচ্ছে হারিস ও হাম্মাম। অন্যদিকে সবচেয়ে ঘৃনিত নাম হচ্ছে হারব ও মুরারাহ। রসুল সাঃ নামের ব্যাপারে সবসময় সচেতন ছিলেন। তিনি শুধু মানুষের নামই রাখেননি, তার প্রিয় ঘোড়াটির নাম রেখেিেছলেন দুলদুল, হযরত আলীর তরবারিটির নাম রেখেছিলেন জুলফিকার ”। এক সাহাবী বিড়াল পুষতেন তাই তাকে তিনি আদর করে বলতেন আবু হোরায়রা ( বিড়ালের পিতা )। বাবার নামের সাথে নাম মিলিয়ে সন্তানের নাম রাখার প্রবণতা বাংলাদেশে কম-বেশি প্রচলিত রয়েছে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ইবনে অথবা বিনতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এটি খুবই বিজ্ঞানসম্মত। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, অর্থাৎ মোবারকের পুত্র আব্দুল্লাহ, সন্তান যদি মেয়ে হয় তাহলে রাখা যেতে পারে ফাতিমা বিনতে মোবারক। এভাবে নাম রাখলে কার ছেলে বা কার মেয়ে কে কার ভাই বা বোন সহজেই চেনা যায়। সৌদি আরবে নামের শেষে গোষ্ঠীর নাম যোগ করার সিস্টেমও চালু রয়েছে। সুরা আযহাবে ( ৩৩:৫ ) বলা হয়েছে , তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ পরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায় সঙ্গত।  ”
যে সব নাম রাখা মাখরুহ সেগুলোর মধ্যে রাবাহ ( লাভবান ), আফনাহ ( সফলকাম ) , নাজাহ ( সফলতা ) অন্যতম। আল্লাহ বলেছেন – কাজেই তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করেছে  সে সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত। ( সুরা নাজম ৩২ ) অতএব  বড়ত্ব , অহমিকা, অহংকার, ও আত্ম প্রসংসামূলক কোন নাম রাখা যাবে না। এজন্যই শাহানশাহ, শাহজাহান, রাজাধিরাজ, রাখা নিষেধ। একইভাবে পীর বখশ ( বখশ শব্দের অর্থ দান বা উপহার ) , দিদার বখশ ইত্যাদি নামগুলো শীরকি নাম । আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন শরিফের সুরা আল আরাফের ১৮০ নম্বর অয়াতে বলেন, “ অল্লাহর অনেক সুন্দর নাম রয়েছে । সে নামগুলোতে তোমরা তাকে ডাকো। আল্লাহর নামের পূর্বে আবেদ যোগ করে শিশুর নামকণে আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। ” তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাস বুঝায় এমন নাম রাখা নিষেধ। যেমন আব্দুর রহমান, আব্দুর রসুল, আব্দুল মুত্তালিব, আব্দুল ওজ্জা, আব্দুশ শামস, আব্দুন নবী ইত্যাদি। আল্লাহর খাস নামে নাম রাখা যাবে না। যেমন আর -রহমান., আর -রহিম, ইত্যাদি। খারাপ অর্থ বহনকারী নাম রাখাও নিষেধ। যেমন হারব, মুররাহ ও হুজন ইত্যাদি। অর্থহীন নাম রাখা যাবে না যেমন জুজু , মিমি ইত্যাদি। খ্রিস্টিয় নাম রাখা হারাম, যেমন মিল্টন, লিটন, লেলিন ইত্যাদি।
রসুল সাঃ এর স্ত্রীদেও নামে আমরা আমাদের প্রিয়তমা কন্যা শিমশুদের নাম রাখতে পারি। এসব নামের মধ্যে খাদিজা, সাওদা, আয়েশা, হাফসা, যয়নব, উম্মে সালমা, উম্মে হাবিবা, জুওয়ারিয়া, সাফিয়া,অন্যতম। এছাড়া তাঁর কন্যা ফাতেমা, রোকেয়া, উম্মে কুলসুম,। এছাড়া বিশিস্ট নেক্কার মহিলা সারা, হাজেরা কিংবা মরিয়মের নামে নাম রাখা যেতে পারে। ছেলেদের নাম রাখা যেতে পারে  আফিফ, হামদান, লাবীব, রাযিন, লাইয়ান, নাবিল, নাদীম, ইমাদ, মাইমুন, তামিম, হুসাম, শাকের । বিশিষ্ট সাহাবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম, রাঃ তাঁর ৯ জন ছেলের নাম রেখেছেন বদর যুদ্ধে শহিদ ৯ জন সাহাবির নামে। তারা হচ্ছেন আব্দুল্লাহ, মুনাযির, উরওয়া, হামযা, জাফর, মুসআব, উবাইদা, খালেদ ও উমর। যে কোন নবীর নামে ছেলে সন্তানের নাম রাখা যেতে পারে। বুখারি শরিফে আছে- তোমরা আমার নামে নাম নাম রাখ। আমার কুনিয়াতে ( উপনাম ) কুনিয়তে নাম রেখো না। ” তাঁর কুনিয়াত ছিল আবুল কাশেম। পবিত্র কুরআন শরিফে আদম, মুসা, হুদ, সোলায়মান, জাকারিয়া, ঈসা, দাউদ, ইব্রাহী, ইউনুস, সহ ২৫ জন নবীর নাম রয়েছে তাদের নামে নাম রাখা যেতে পারে। মুসলমান পিতামাতা সন্তানের নাম ইসলামি আকিদা অনুযায়ী রাখতে চায়। কিন্তু অজ্ঞতাবশত আমরা অনেক সময় অনৈসলামিক নাম রেখে ফেলি। অনেকে মনে করেন শব্দটি কুরঅন মজিদে থাকলেই হলো। আমি যদি আমার ছেলেকে পতিদিন ১০ বার ডাকি তাহলে প্রতি হরফের জন্য আমি ১০ নেকি করে পাব। তাছাড়া কুরআন মজিদে রক্ষিত শব্দের চেয়ে উত্তম শব্দ আর কি হতে পাওে ? তাদের ধারণা ঠিক আছে । তবে কুরঅন শরিফে ফেরআউন, হামান, কারুন, আবু লাহাবসহ বহু কাফেরের নাম রয়েছে, এছাড়া ইবলিশ শযতানের নামও রয়েছে । এগুলো কী রাখা যাবে ? সুতরাং অর্থ না বুঝে কোন নাম রাখা যাবে না। আমাদের সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, আমার সোনামনির নামটি এমন হবে যা এযাবৎকাল কেউ রাখে নি। এ ধারণার কোন ভিত্তি নেই। তাই অন্য কিছু চিন্তা না করে  আল্লাহকে হাযির-নাযির জেনে রসুলের ত্বরিকা মোতাবেক ইসলামি নাম রাখা প্রত্যেক পিতামাতার একান্ত কর্তব্য।
লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা,গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের ক্যাম্পেনার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক ও সাংবাদিক, ধর্মীয় গবেষক,সহকারী সম্পাদক,দৃষ্টান্ত ডট কম কুমিল্লা।০১৭১১৭১৩২৫৭   
ওহির আলোকে-সন্তানের নাম রাখা
সুরা আযহাবে ( ৩৩:৫ ) বলা হয়েছে , তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ পরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায় সঙ্গত।  ”
কুরআন শরিফের সুরা আল আরাফের ১৮০ নম্বর অয়াতে বলেন, “ অল্লাহর অনেক সুন্দর নাম রয়েছে । সে নামগুলোতে তোমরা তাকে ডাকো। আল্লাহর নামের পূর্বে আবেদ যোগ করে শিশুর নামকণে আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। ”
যে সব নাম রাখা মাখরুহ সেগুলোর মধ্যে রাবাহ ( লাভবান ), আফনাহ ( সফলকাম ) , নাজাহ ( সফলতা ) অন্যতম। আল্লাহ বলেছেন – কাজেই তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করেছে  সে সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত। ( সুরা নাজম ৩২ ) অতএব  বড়ত্ব , অহমিকা, অহংকার, ও আত্ম প্রসংসামূলক কোন নাম রাখা যাবে না। এজন্যই শাহানশাহ, শাহজাহান, রাজাধিরাজ, রাখা নিষেধ। একইভাবে পীর বখশ ( বখশ শব্দের অর্থ দান বা উপহার ) , দিদার বখশ ইত্যাদি নামগুলো শীরকি নাম । আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন শরিফের সুরা আল আরাফের ১৮০ নম্বর অয়াতে বলেন, “ অল্লাহর অনেক সুন্দর নাম রয়েছে । সে নামগুলোতে তোমরা তাকে ডাকো। আল্লাহর নামের পূর্বে আবেদ যোগ করে শিশুর নামকণে আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। ”
হাদিসে এসেছে, মহিলা সাহাবি যয়নব ( রাঃ)  এর নাম ছিল বাররাহ  ( পূর্ণবতী ) । তা শুনে রসুল সাঃ বলেন, তুমি কি আত্মস্তুতি করছো ? তখন রাসুল সাঃ তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন “ যয়নব”।  (ইবনে মাজাহ ৩৭৩২ )
মমিনুল ইসলাম মোল্লা

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.