শৈশবের রাজনীতি – ন্যাপ মোজাফফরের কথা

 শৈশবের রাজনীতি – ন্যাপ মোজাফফরের কথা

আমার শৈশব কেটেছে কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার ৭ নং এলাহাবাদ ইউনিয়নের এলাহাবাদ গ্রামে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই শুনেছি অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ ন্যাপ নেতা। তখন ন্যাপ নেতা কি, বুঝতাম না। তবে বড় ভাই মনিরুল ইসলাম মোল্লার সাথে যখন মিছিলে গিয়েছি, তখন মিছিলের তালে তালে স্লোগান দিতাম – “বিশ্বনেতা মুজাফফর – মার্কা তাহার কুড়ের ঘর।” এখনো গুগল ম্যাপে আমাদের “মোল্লা বাড়ি” লোকেশন হিসেবে বিশ্ব নেতা মুজাফফর আহমদ রোড লেখা আছে। মিছিল চলত এলাহাবাদ থেকে ফুলতলী, মোহাম্মদপুর, কুড়াখাল, গৌরসার ও বামনিসাইর পর্যন্ত।

অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ ১৪ এপ্রিল ১৯২২ সালে কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৩৭ সালে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে, যখন তিনি ছাত্র সংগঠন ‘স্টুডেন্ট ফেডারেশন’-এ যুক্ত হন। এই সময় থেকেই তিনি বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন এবং ১৯৫৪ সালে জুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।

১৯৫৭ সালে National Awami Party গঠনের সময় তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন মূল দলের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে পার্টি বিভাজনের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের NAP (Wali/প্রো‑সোভিয়েত) এর সভাপতি হন। এই সময়ই তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে মাওলানা ভাসানীর সাথে, কারণ তারা উভয়েই বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ন্যাপ (মুজাফফর) বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। ১৯৭৯ সালের ২য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ ন্যাপ (মুজাফফর)-এর প্রতীকে প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২টি আসন জয়ী হয়, কিন্তু ৪র্থ নির্বাচনে কোনো আসন পায়নি। ৫ম নির্বাচনে আবার ১টি আসন জিততে সক্ষম হয়। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ন্যাপ, সিপিবি ও প্রগতিশীল শক্তির সমর্থনে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এই সব তথ্য আমাদের শেখায়, ছোট রাজনৈতিক দলগুলোও গণতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। ন্যাপ (মুজাফফর)-এর প্রাপ্ত মোট আসন ৪টি, যা দল ও অধ্যাপক মুজাফফর আহমদের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রভাবকে তুলে ধরে।

শৈশবের স্মৃতি, মিছিল ও রাজনৈতিক স্লোগান আমাদের সেই সময়ের জীবন্ত অভিজ্ঞতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগের প্রতিফলন। তখনকার স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন (অব:) সুজাত আলী ও আজিজ খান উল্লেখযোগ্য ছিলেন, যারা আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। আজও গ্রামে তাদের নাম স্মৃতির অংশ, যেমন “আজিজ নগর।”

লেখক পরিচিতি: মমিনুল ইসলাম মোল্লা, শিক্ষক, উইকি সংকলক ও গুগল কন্ট্রিবিউটর, কুমিল্লা।

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.