রক্তাক্ত -৭১ : জাফরগঞ্জের প্রতিরোধ যুদ্ধ//
রক্তাক্ত -৭১ : জাফরগঞ্জের প্রতিরোধ যুদ্ধ//
মমিনুল ইসলাম মোল্লা শিক্ষক সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক, কুমিল্লা।।
জাফরগঞ্জের প্রতিরোধযুদ্ধ ১৯৭১
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ গ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধযুদ্ধের সাক্ষী। পাকিস্তানি সেনারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যখন মীরপুর থেকে ময়নামতি সেনানিবাসের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন স্থানীয় জনতা তাদের প্রতিহত করতে এগিয়ে আসে।
কালিকাপুরে পৌঁছে বেগমাবাদ গ্রামের উসমান আলী এক সেনাকে কোচের আঘাতে হত্যা করেন। একই দলে থাকা ১৫ জন পাকসেনার মধ্যে সাতজন বিভিন্ন স্থানে নিহত হয়। অবশিষ্ট সাতজন আশ্রয় নেয় জাফরগঞ্জ শ্রীপুরপাড় জামে মসজিদে। কিন্তু স্থানীয় জনতা তাদের হত্যা করে—দুজনকে মাটিতে পুঁতে ফেলে এবং পাঁচজনের লাশ গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
এই প্রতিরোধযুদ্ধে বাবেরা, চরবাকর, লক্ষ্মীপুর ও বানিয়াপাড়া গ্রামের মানুষও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। আব্দুর রহমান পুলিশ ও ন্যাপ নেতা মুস্তাকুর রহমান ফুল মিয়া দুজন পাকসেনাকে হত্যা করেন। লক্ষ্মীপুরের ফজলুল হক অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শহীদ হন। বাবেরা গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক সরকারসহ অনেকে আহত হন। বানিয়াপাড়া ও বাবেরা গ্রামের ইন্দন মিয়া সরকার, সাইয়দ আলী ও আব্দুল মজিদ সরকার শহীদ হন।
দেবীদ্বার থানার ওসি এস এম রকিবুল হক চৌধুরী অস্ত্রাগারের চাবি জনতার হাতে তুলে দেন। জনতা অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনে ওসি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং মৃত্যুবরণ করেন।
৩১ মার্চ ভোরে ভিংলাবাড়ি এলাকায় পাকসেনারা অবরুদ্ধ হয়। মুহূর্তেই হাজারো মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চাঁপানগরের আবুল কাসেম হাজারী এক পাকসেনাকে ইট ছুঁড়ে আঘাত করলে শহীদ হন। জনতা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন পুলিশ ও সেনাসদস্যও প্রতিরোধে যোগ দেন।
ভিংলাবাড়ি-জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদে সংঘটিত যুদ্ধে ১৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। অপরদিকে পাঁচজন প্রতিরোধযোদ্ধা শহীদ হন।
জাফরগঞ্জের এই প্রতিরোধযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। সাধারণ মানুষ, পুলিশ ও সেনাসদস্য একত্রে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন—বাংলার মাটি দখলদারদের কাছে কখনো পরাজিত হবে না।
লেখক পরিচিতি -মমিনুল ইসলাম মোল্লা। শিক্ষক, উইকি সংকলক ও গুগুল কন্ট্রিবিউটর কুমিল্লা।।

No comments