দেবিদ্বার-কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জনপদ
দেবিদ্বার-কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জনপদ
মমিনুল ইসলাম মোল্লা , মুরাদনগর , কুমিল্লা , প্রতিনিধি
কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জনপদ দেবিদ্বার উপজেলা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ধারায় সমৃদ্ধ এক প্রাচীন অঞ্চল। গোমতী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদ ১৯১৫ সালে থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮০ সালে উপজেলায় উন্নীত হয়। বর্তমানে এটি কুমিল্লার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উপজেলার আয়তন প্রায় ২৩৮.৩৬ বর্গকিলোমিটার এবং এখানে ১৫টি ইউনিয়ন, শতাধিক মৌজা ও গ্রাম নিয়ে বিস্তৃত জনবসতি গড়ে উঠেছে।
দেবিদ্বার নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক মত। স্থানীয়দের একটি মতে, একসময় এ অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি বেশি ছিল এবং দেব-দেবীর উপাসনার স্থান বা ‘দ্বার’ থেকেই ‘দেবীদুয়ার’ নামের উৎপত্তি, যা পরে দেবিদ্বারে রূপ নেয়। অপরদিকে, আরেকটি মত অনুসারে ব্রিটিশ আমলে জন ডেভিডের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ থেকে ‘ডেভিডওয়ার’ শব্দটি ক্রমে ‘দেবিদ্বার’ হয়ে যায়। যদিও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও এ দুটি মতই লোকমুখে প্রচলিত।
রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকেও দেবিদ্বার সুপরিচিত। এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মোজাফফর আহমদ, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেবিদ্বারের মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। বিশেষ করে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে পাকবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু বাঙালি শহীদ হন। দেবিদ্বার নিউমার্কেট এলাকায় আজও সেই স্মৃতির সাক্ষ্য হিসেবে একটি গণকবর বিদ্যমান।
ধর্মীয় ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও এ অঞ্চল সমৃদ্ধ। ধারণা করা হয়, ১১৫০ সালের দিকে শাহ মোহাম্মদ আব্বাস হুসাইনী এখানে ইসলাম প্রচার করেন। এছাড়া শাহ জালাল-এর সফরসঙ্গীদের মাধ্যমেও এ অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। গুনাইঘরের বাইতুল আজগর গম্বুজ মসজিদ, নূরমানিক চরের প্রাচীন মসজিদ এবং চরবাকরের শাহ বাকেরের মসজিদ এ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পাশাপাশি ধামতী গ্রামের প্রাচীন শিব মন্দির হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন হিসেবেও দেবিদ্বারের গুরুত্ব অপরিসীম। ময়নামতি অঞ্চলের অংশ হওয়ায় এখানে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। গুনাইঘর থেকে আবিষ্কৃত তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, ৫০৭ খ্রিষ্টাব্দে এখানে ‘আশ্রম বিহার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা এ অঞ্চলের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্মীয় চর্চার প্রমাণ বহন করে।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। ধান, পাট, আলু ও ভুট্টা উৎপাদনে দেবিদ্বার কুমিল্লার মধ্যে অগ্রগণ্য। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। পাশাপাশি খাদি শিল্পের জন্যও এ অঞ্চল সুপরিচিত। মহাত্মা গান্ধী-এর প্রেরণায় গড়ে ওঠা এই শিল্প একসময় আন্তর্জাতিক বাজারেও সমাদৃত ছিল।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেবিদ্বার অগ্রসর। এখানে বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে। দেবিদ্বার এস.এ. সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলের শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান, কৃষি ও শিক্ষা—সব মিলিয়ে দেবিদ্বার আজও গোমতী পাড়ের এক জীবন্ত ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।

No comments