শৈশবের টিকাদান–স্মৃতি: একটি আত্মকথন
শৈশবের টিকাদান–স্মৃতি: একটি আত্মকথন
আমার নাম মমিনুল ইসলাম মোল্লা। আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি আজও মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে, বিশেষ করে বিদ্যালয়ের টিকাদান কর্মসূচির অভিজ্ঞতা।
১৯৮০ সালে আমি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই। তখনকার গ্রামীণ জীবন ছিল খুবই সাধারণ এবং অনেকটা কষ্টসাধ্য। বিদ্যালয়ের পরিবেশও আজকের মতো উন্নত ছিল না। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজা-জানালার সম্পূর্ণ পাল্লা ছিল না। অনেক সময় ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস আসত। আমাদের কুরুইন প্রাথমিক বিদ্যালয়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সেখানে চারটি চেয়ার শিকল দিয়ে টিনের ঘরের খুঁটির সাথে বাঁধা থাকত, যাতে চুরি না হয়।
১৯৮২ সালে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রথমবার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। তখন টিকাদান ব্যবস্থা ছিল একেবারেই ভিন্ন। একজন শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়ার পর সেই সিরিঞ্জ আগুন জ্বালিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হতো। এই দৃশ্য আমাদের ছোট মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করত। অনেকেই সেই দৃশ্য দেখে ভাঙা জানালা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে পাশের পাটখেতে লুকিয়ে যেতাম।
তবে পালানো সবসময় সফল হতো না। একদিন পালাতে পারলেও পরের দিন ঠিকই ধরা পড়ে আবার টিকা নিতে বাধ্য হতাম। সেই সময় শিশুদের মধ্যে টিকা নিয়ে ভয় ছিল খুবই সাধারণ বিষয়।
বিশেষ করে বিসিজি (BCG) টিকা আমাদের কাছে আরও ভয়ংকর মনে হতো। কারণ এই টিকা চামড়ার ওপর দেওয়া হতো এবং পরে সেখানে ছোট গর্ত বা দাগ তৈরি হতো। অনেক সময় জায়গাটি ফুলে যেত বা ইনফেকশন দেখা দিত, তখন আবার ওষুধ খেতে হতো। সেই টিকার দাগ আজও আমার শরীরে শৈশবের স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আমাদের এলাকায় কিছু উন্নয়নমূলক পরিবর্তন শুরু হয়। ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ দেবীদ্বার আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আমাদের এলাহাবাদ গ্রামই ছিল তার বাড়ি। একই সময়ে আবুল বাশার ভূইয়া দেবীদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন, যাঁর বাড়িও আমাদের গ্রামেই ছিল। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় এলাকায় বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে থাকে।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে, আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমাদের বিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিমের সহযোগিতায় টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এবার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ আর পালায়নি। স্বাস্থ্যকর্মীরা হাসিমুখে আমাদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করতেন—“তুমি কোন ক্লাসে পড়, রোল কত, তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?” এই প্রশ্নের মাঝেই তারা টিকা দিয়ে দিত।
ভয় আর আতঙ্কের জায়গায় তখন ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আস্থা, সচেতনতা এবং অভ্যাস।
এর পাশাপাশি আমাদের দেওয়া হতো হামের টিকা। Measles vaccine শিশুদের হাম রোগ থেকে রক্ষা করে। হাম একটি খুবই ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই টিকা শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, ফলে ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে এটি নিয়মিতভাবে দেওয়া হয়।
সেই সময়ের টিকাদান আমাদের শৈশবকে শুধু ভয় নয়, বরং ধীরে ধীরে সচেতনতার শিক্ষা দিয়েছিল। আজও যখন আমার হাতে সেই বিসিজি টিকার পুরনো দাগ দেখি, তখন মনে হয়—এটি শুধু একটি দাগ নয়, বরং আমার শৈশব, আমার গ্রামের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য উন্নয়নের এক নীরব সাক্ষীপরিচিতি
মমিনুল ইসলাম মোল্লা একজন সাংবাদিক, শিক্ষক, উইকি সংকলক ও গুগল কন্ট্রিবিউটর। কুমিল্লা।।।

No comments