ঘুরে এলাম ময়নামতি

 

ঘুরে এলাম ময়নামতি


রোকন উদ্দীন মাহমুদঃ যাব যাব করে অনেক দিন আটকে আছে আমাদের পিকনিকটা। কোথায় যাব এটাই বড় সমস্যা। অবশেষে ঠিক হল কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি যাব। শুনেছি প্রাচীন ইতিহাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এ অঞ্চলটি। সঙ্গে আছে ময়নামতি জাদুঘর। তাই যায়গাটি দেখার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। দিনক্ষণ দেখে সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম একটি মাইক্রোবাসে করে। আমরা ছেলেমেয়ে মিলে মোট ৮ জন। এর মাঝে আরিফ আবার ছোট-খাটো শিল্পী। খাবার-দাবার প্যাকেট করে আমরা যখন রওনা দেই, ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা। নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লা যেতে আমাদের প্রায় ৯৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। গরমকে পরাজিত করে হেমন্তের হিম হিম বাতাস বইছিল। সূর্যি মামা তখনও আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক তখনও ফাঁকা। এরই মাঝে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে অবিরাম বেগে। মাঝে মাঝে সাঁই সাঁই করে দু’একটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে আমাদের পাশ কাটিয়ে। আমরা প্রাণ ভরে উপভোগ করছি দু’পাশের সবুজ ধান ক্ষেত আর জলরাশি। এমন সময় আরিফ গান গেয়ে উঠল, সবাই তার সঙ্গে গেয়ে উঠলাম। প্রায় ঘণ্টা খানেক চলার পর আমরা মেঘনা ব্রিজের ওপর পৌঁছলাম। এখানে নামার ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু মাসুমের অনুরোধ আর মেঘনার নীলাভ শান্ত জল দেখে লোভ সালামাতে পারলাম না। সুমা কখনও লঞ্চ দেখেনি দূরে একটি লঞ্চ আসছিল তাই দেখে সে আÍহারা। ঘুরতে হবে অনেক জায়গা তাই বেশিক্ষণ দেরি করলাম না। গাড়িতে উঠে পড়লাম। এক সময় পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য ময়নামতিতে। কুমিল্লা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান। গাড়ি থেকে নেমে সোহেলের প্রথম কথাÑ নারে ঠিক জায়গাতেই এসেছি। আমার পয়সা অসুল। এরপর ঘোরাঘুরির পালা। প্রথমে গেলাম শালবন বিহার। এটি দেব বংশের রাজা ভবদেবের স্মৃতিচিহ্ন। আজ থেকে ১২ শতক বছর আগে ৮ম শতাব্দীতে নির্মিত হয়। শালবন বিহার তারই ধ্বংসাবশেষ। সেখান থেকে গেলাম ময়নামতি জাদুঘর। এখানে রক্ষিত প্রাচীনকালের পুরাকৃতি ওই সময়ের ব্যবহƒত আসবাবপত্র, মুদ্রা ইত্যাদি। সবচেয়ে ভালো লাগল, কষ্টি পাথরের বৌদ্ধ মূর্তিটি। ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখলাম। দেখতে দেখতে এক মুহূর্তে মনে হল প্রাচীন যুগে চলে এসেছি। তারপর ইটা খোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, লালমাইয়ের গজারী বন। একে একে দেখলাম আর উপভোগ করলাম মনভরে। সব কিছুই লালমাই-ময়নামতির ছোট ছোট পাহাড়ি শ্রেণীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। যা ১৭ কিলোমিটার উত্তর-দক্ষিণে এবং ৫ কিলোমিটার পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত।
সবশেষে গেলাম বার্ডে। এখানেই বিখ্যাত ছবি দিপু নাম্বার টু নির্মিত হয়েছে। সেই পাহাড় সেই পথঘাট দিয়ে হেঁটে হেঁটে এর সৌন্দর্য জমা করলাম মনের ডালায়। এর ভেতরে শেষপ্রান্তে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে ছোট ছোট পাহাড়। আর সবুজ বন-বাদারী। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটি ছবি। সেই ছবি যেন হাতছানিতে ডাকছে আমায়। বার্ডের ভেতরেও রয়েছে উঁচু উঁচু অনেক টিলা। সবাই মিলে ডুকে গেলাম সেই টিলা আর জঙ্গলের ভেতর। প্রথম প্রথম ভয় ভয় লাগছিল। সবাই মিলে হৈচৈ করে যখন দৌড় দিলাম তখন ভয় কেটে গেল। জেগে উঠল ভালো লাগা। মনে হল অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছি। ফিরে আসার সময় সবার দেখাদেখি লোহার সিঁড়ি বেয়ে নাইমাও পানির ট্যাংকিতে উঠে গেল। সেই ট্যাংকি যেখানে দিপুর বন্ধু উঠে আর নামতে পারেনি। আশ্চর্য নাইমারও একই অবস্থা। নিচে তাকিয়ে ভয়ে আটকে গেল। নামতে সাহস পাচ্ছে না। তাই দেখে সবাই হেসে ওঠল। কেউ নামাতে যাচ্ছে না দেখে শেষে কান্নাকাটির অবস্থা।।
এভাবেই বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। আমরাও পা বাড়ালাম বাড়ি ফিরতে। কিন্তু মন আসতে চাইছিল না। তবু ফিরতে তো হবেই। দূরন্ত গাড়ির গতি আর আরিফের গান শুনতে শুনতে ফিরে এলাম বাড়িতে।


No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.