বাংলা নববর্ষ ও কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প //

 বাংলা নববর্ষ ও কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প //বাংলা নববর্ষ ও কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প //


মমিনুল ইসলাম মোল্লা , মুরাদনগর , কুমিল্লা ,প্রতিনিধি ।।

বাংলার প্রাচীনতম ও সমৃদ্ধ লোকশিল্পগুলোর মধ্যে মৃৎশিল্প অন্যতম। মাটি দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শৈল্পিক দ্রব্য তৈরির এই শিল্প হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই শিল্প শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা সাধারণত কুমার নামে পরিচিত। তারা হিন্দু নবশাখা গোত্রভুক্ত এবং ধর্মীয়ভাবে বিষ্ণুর উপাসক হিসেবে পরিচিত। বরুণদা অঞ্চলে কুমারদের “পাল” নামে ডাকা হয়। এই পাল সম্প্রদায়ের মধ্যেই রুদ্র পালরা প্রধানত মাটির তৈরি জিনিসপত্র তৈরির কাজ করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশাকে ধরে রেখে আসছেন, যা বাংলার লোকঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে।

পাল সম্প্রদায়কে ঘিরে বকুলবাগ অঞ্চলে একটি লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ঈশ্বর যখন বিভিন্ন গোষ্ঠীকে আলাদা আলাদা উপাধি প্রদান করছিলেন, তখন পালদের জন্য আর কোনো উপাধি অবশিষ্ট ছিল না। তখন ঈশ্বর তাদের “হালাম পাল” নামে পরিচিত করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এই গল্পটি বাস্তব ইতিহাসের চেয়ে বেশি লোকবিশ্বাস হলেও এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত এই সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

কুমাররা মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারিক ও সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য তৈরি করে থাকেন। মৃৎচক্র বা চাকা তাদের প্রধান হাতিয়ার। এই চাকার সাহায্যে তারা কলসি, হাঁড়ি, পাতিল, সরা, মাটির ব্যাংক, খেলনা, ফুলের টব, পুতুল এবং দেব-দেবীর মূর্তি তৈরি করেন। গ্রামীণ জীবনে এসব পণ্যের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পানি সংরক্ষণ, রান্না এবং দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজে মাটির পাত্র এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক এলাকায় এখনো অটুট রয়েছে।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে মৃৎশিল্পের একটি বিশেষ দিক হলো লক্ষ্মীর সরা। এটি হিন্দু ধর্মে ধন ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পূজা-পার্বণে এটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একইভাবে নকশি হাঁড়ি বা সন্ধের হাঁড়ি মৃৎশিল্পের আরেকটি অনন্য উদাহরণ। মাটির গায়ে রঙ, ফুল, পাখি ও নানা নকশা অঙ্কনের মাধ্যমে এই হাঁড়িগুলো তৈরি করা হয়। এতে শিল্পীর সৃজনশীলতা, ধৈর্য ও নান্দনিক বোধের অসাধারণ প্রকাশ দেখা যায়।

মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শিল্পচেতনার সমন্বিত রূপ। আধুনিকতার চাপে কিছুটা পরিবর্তন এলেও এই শিল্প আজও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মৃৎশিল্প ভবিষ্যতেও বাংলার ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবে।

লেখক পরিচিতি -মমিনুল ইসলাম মোল্লা শিক্ষক সাংবাদিক ও কলামিস্ট কুমিল্লা।।


No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.