কুমিল্লার ঐতিহ্য

 আরও দেখুন

Geographic Reference
City & Local Guides
Maps
ঐতিহ্যের কুমিল্লা, সম্ভাবনার কুমিল্লা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৩, ১:১৯ এএম
   


 ঐতিহ্যের কুমিল্লা, সম্ভাবনার কুমিল্লা


সংস্কৃতি একটি ব্যাপকতর শব্দ এর ব্যাপ্তি, পরিসর, বিশালতা মহাসমুদ্রের মতই অসীম। সাধারণ মতে আমরা যদি সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করতে যাই তাহলে সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনধারা। এ জীবন ধারায় অন্তর্ভুক্ত হল মানুষের সমগ্র সৃষ্টি যেমন ভাষা, কলা, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইন, দর্শন, রাষ্ট্র, নৈতিকতা, ধর্ম, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, মূল্যবোধ, প্রথা ইত্যাদি। সমাজ হল মানবীয় সম্পর্কের কতগুলো ব্যবস্থার সমষ্টি। আর এসব সম্পর্ক নির্ধারণ করে সংস্কৃতি। সমাজে মানুষ সংস্কৃতির মাধ্যমেই নিজেদের মাঝে ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলে যাতে করে এর সদস্যরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অর্জন করতে শেখে। আবার প্রয়োজনে কিংবা অভিলাষের প্রেরণায় পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় আপন মর্যাদা ও ভুমিকা দিয়ে সংস্কৃতির রূপায়ন ও পরিবর্তন ঘটায়।

সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর ইতিহাস পাশাপাশি হাত ধরে চলে। ইতিহাস ঐতিহ্যকে নির্মাণ করে। ইতিহাসের মৌল উপাদান হলো মানুষ ও তার চারপাশের ঘটনাপ্রবহের দলিল দস্তাবেজ ইত্যাদি। আমাদের দেশে ইতিহাস চর্চার একটি বড় সমস্যা হচ্ছে নির্মোহ হয়ে উঠতে না পারা।

আরও দেখুন
Geographic Reference
Maps
City & Local Guides

 বঙ্কিম চন্দ্রের চিন্তা চেতনা, মতবাদ নিয়ে পাঠক সমাজে মতভেদ থাকতে পারে, তার সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সর্বজনবিদিত। তবে তার মেধা নিয়ে বোধ করি কারো মধ্যেই কোনো দ্বিধা নেই। সেই বঙ্কিম বলেছেন “বাঙ্গালার ইতিহাস নাই, যাহা আছে তাহা ইতিহাস নয়, তাহা কতক উপন্যাস, কতক বাঙ্গালার বিদেশী পরপীড়কদের জীবনচরিত্র মাত্র। বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব আমরা সকলেই লিখিব। যে বাঙ্গালী তাহাকেই লিখিতে হইবে। মা যদি মরিয়া যায় মার গল্প করিতে কত আনন্দ! আর এই আমাদিগের সর্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গালাদেশ, ইহার গল্প করিতে কি আমাদের আনন্দ নাই? আইস আমরা সকলে মিলিয়া বাংলার ইতিহাসের অনুসন্ধান করি। যাহার যতদূর সাধ্য, সে ততদূর করুক। ক্ষুদ্রকীট যোজনব্যাপী দ্বীপ নির্মাণ করে। একের কাজ নয় সকলে মিলিয়া করিতে হইবে।”
সেই চেষ্টার অংশ হিসেবেই আমি কুমিল্লার ঐতিহ্য নিয়ে লেখার চেষ্টা করি। সেগুলি আদৌ লেখা হয়ে উঠে কিনা কিংবা পাঠযোগ্য কিনা তার বিচারের ভার পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিলাম।

কুমিল্লার জনপদের মধ্যে কুমিল্লা শহরকে আমরা নবীনতম হিসেবে ধরে নিতে পারি। যদিও সমতটের রাজধানী ছিল কুমিল্লা কিংবা দেব বংশের শাষনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুমিল্লা। খড়গ বংশের রাজধানী ছিল কুমিল্লা। কিন্তু এর কোনটিই শহর কুমিল্লা নয় এর পাশ্ববর্তী অঞ্চল সমুহ। আমরা সবাই কুমিল্লা কে পথিকৃৎ বলি। কেন পথিকৃৎ সেটা বলার চেষ্টা করি না। কুমিল্লা পথিকৃৎ হচ্ছে শিক্ষার জন্য। আমরা সবাই জানি উপমহাদেশের প্রথম বিদ্যাপিঠ হচ্ছে বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে যেই বিদ্যাপিঠের কর্ণধার ছিলেন কুমিল্লারই কীর্তিমান পুরুষ পন্ডিত শীলভদ্র। আনুমানিক ৫০৭-৫০৮ সনের দিকে দেবীদ্বারের গুনাইঘর বা তার নিকটবর্তী স্থানে “আশ্রম বিহার” ও “রাজবিহার” নামে দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। যার শিক্ষাগুরু ছিলেন যথাক্রমে আচার্য শান্তিদেব এবং আচার্য জিত সেন।
আরও দেখুন
City & Local Guides
Geographic Reference
Maps

১৮৩৭ সনে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা জিলা স্কুল। ফ্রান্সিস বুকানন তার ভ্রমন কাহিনীতে লিখেছেন “ তিনি যখন ঢাকা থেকে কুমিল্লার উপর দিয়ে চট্টগ্রাম গমন করেন তখন কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জ এলাকায় গিরিধারী স্কুল নামে একটি বিদ্যাপীঠের সন্ধান পান। এটি জিলাস্কুল প্রতিষ্ঠারও আগের ঘটনা।
বেগম রোকেয়ার জন্মের ৭ বছর পূর্বে ১৮৭৩ সনে নারী শিক্ষার জন্য নবাব ফয়জুন্নেসা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হল ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়। রায় বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ শুধু চট্টগ্রাম বিভাগে নয় বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ । তবে এটাও সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর কুমিল্লায় ২য় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনা থাকা সত্বেও কুমিল্লার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারনে সেটি চট্টগ্রামে চলে গেছে।
কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মানে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। যার বেশিরভাগই ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে উৎসরিত। প্রগতির সাথে আধ্যাত্মিকতার এক অপুর্ব মেলবন্ধন মলয়া সঙ্গীত। এ ভূমির সন্তান মনোমোহন দত্ত, লবচন্দ্রপাল, ও ফকির আফতাব উদ্দিন এই ত্রয়ীর সৃষ্টি মলয়া সঙ্গীত আজ চর্চার অভাবে লুপ্ত হবার পথে। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বৃহত্তর কুমিল্লা কেন ,বিশ্ব সংস্কৃতির সম্পদ। আমরা রবি শংকরের কথা বলি অথচ যিনি না হলে রবি শংকর হতেন না সেই আলাউদ্দিন খাঁর নাম বলি না। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর কথা  বলি না। এই ব্রাহ্মণবাড়ীয়া মঈনপুরের সন্তান ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু আজ এক বিস্মৃত নাম।
আরও দেখুন
City & Local Guides
Maps
Geographic Reference

তারা কোন সময় অর্থের চিন্তা করেননি। মানুষকে সমাজকে দেবার চিন্তা করেছেন। অথচ আজ এই ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিগুলো আক্রান্ত হচ্ছে বারবার। আমরা ভুলতে বসেছি ওস্তাদ রওশন আরা বেগমকে রবি শংকর যাকে অন্নপূর্না নামে ডাকতেন, ওস্তাদ আলী আকবর, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁন, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ওস্তাদ মীর কাশেম খান, ওস্তাদ আবেদ খান, ওস্তাদ কিরীট খানদের যে পরম্পরা তা মোবারক হোসেন খান আর শেখ সাদী খানের পরে এক জায়গায় থমকে আছে।
রাজ দরবার থেকে হাটে, মাঠে ঘাটে যিনি কুমিল্লার ভাষাকে তুলে ধরেছেন তিনিই সুরের রাজকুমার শচীন দেববর্মন। তার সুরের ইন্দ্রজাল এখনো আমাদের মোহবিষ্ট করে। দুঃখজনক হলেও সত্য তার বাড়ীটি দীর্ঘদিন মুরগীর খামার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদেরকে এখনও লড়াই করতে হয় শচীন কর্তার স্মৃতি চিহ্নটিকে ধরে রাখতে। কিন্তু সুরসাগর হিমাংশু দত্তের কুমিল্লা শহরের ঝাউতলার বাড়ীটি দখলদারদের কবলে পড়ে আজ মসজিদে রুপান্তরিত হয়েছে। দখলকৃত জায়গায় মসজিদ বানানো ইসলাম ধর্মে জায়েজ কিনা তা আপনারাই জানেন। সুরের মহান সাধক মির্জা হোসেন আলীর নাম এ প্রজন্ম জানেই না। সঙ্গীতের জগতে কুমিল্লার সমৃদ্ধ ধারাটি এখনো বহন করে চলেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং শেখ সাদী খান। যিনি “জয় বাংলা, বাংলার জয়” এর মত কালজয়ী সঙ্গীত রচনা করেছেন।
আরও দেখুন
City & Local Guides
Geographic Reference
Maps

কি আমাদের হীনমন্যতা, ইতিহাস চর্চা না থাকায় সুগায়ক ও গীতিকার ভূবনচন্দ্র রায়, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খান, শৈলবালা দেবী, সুরেনদাশ এর নাম এক রকম বিস্মৃতির অতলেই চলে গেছে। বোদ্ধাদের বাইরে সূধীন দাস ও পরিমল দত্ত, কুলেন্দু দাশ, সুখেন্দু চক্রবর্তীর নাম ক’জনই বা মনে রেখেছে। আল মাহমুদকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস রচনা শুধু অসম্ভব নয় অকল্পনীয় বটে। যিনি লিখেছেন- “ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায় বরকতেরই রক্ত”। আল মাহমুদের আদর্শিক বিশ^াসের পতন হয়েছে এটি যেমন সত্য, আমরা তার নির্মোহ সাহিত্য মূল্যায়ন করতে পারিনি এটিও সত্য। কিন্তু তিনি ইতিহাসে থেকে যাবেন।

বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় কুমিল্লা টাউনহল মঞ্চ এবং ভার্নাল থিয়েটারের অবদান অপরিসীম। যদিও ১৯০৮ সালে ভার্নাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেও বিচ্ছিন্নভাবে নাট্যচর্চা হতো। বাঙ্গালী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম নাট্যদল হল ১৮৩১ সনে প্রসন্ন কুমার এর “হিন্দু থিয়েটার”। ১৮৮৫ সনে কুমিল্লা টাউনহল প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯০৮ সনে প্রবোধচন্দ্র রায় সহ শহরের আরও কয়েকজন সংস্কৃতমনা ব্যক্তি ভার্নাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। কুমিল্লা টাউনহলের মঞ্চটি মূলত ভার্নাল থিয়েটার এর ই করা।
 সে সময়ে মুন্সিবাড়ীর নাসির উদ্দিনের উদ্যেগে টাউন হল মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় শেক্সপিয়ার এর মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকটি। এই মঞ্চে অভিনয় করেছেন সুলতান মাহমুদ মজুমদার, দাগু বর্ধন, পুতুল বর্ধন, ওবায়দুল হক, প্রতীতি দত্ত, জীতেন্দ্রনাথ দত্ত, সালাউদ্দিন, রুহুল আমীন, সালেহা থেকে শুরু করে হাল আমলের প্রয়াত মন্ত্রী আকবর হোসেন পর্যন্ত।
পাকিস্তান আমলের বিখ্যাত রূপবান ছবির প্রযোজক কামালউদ্দিন, পরিচালক সালাউদ্দিন, তাজেল কন্যা খ্যাত চন্দনা, কিংবা ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধু প্রতীতি দেবীর অভিনয়ের হাতেখড়ি কিন্তু এই ভার্নাল থিয়েটারেই। নাট্যগুরু সাইদ আহমেদ তার জীবনের সাতরং বইয়ে লিখেছেন ১৯৫০ সনে তিনি তার দল নিয়ে ঢাকা থেকে এসে তিনদিন ব্যাপী কুমিল্লা টাউন হল মঞ্চে মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলেন দর্শনীর বিনিময়ে। কুমিল্লার নাট্যচর্চাকে পৃষ্ঠপোষকতা করার ক্ষেত্রে একটি পরিবারের অবদান কখনও সেভাবে আলোচনায় আসেনি তা হচ্ছে ডেলনী পরিবার। ঢাকা কিংবা কলকাতা থেকে কোন নাটকের দল আসলে তাদের কে ডেলনী পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে হতো।
আরও দেখুন
City & Local Guides
Maps
Geographic Reference

প্রসঙ্গত একটি কথা বলতে ভুলে গেছি তা হচ্ছে কুমিল্লা অভয় আশ্রমের প্রাণপুরুষ ডা. সুরেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যয়ের আমন্ত্রণে ১৯২৬ সনের ১৯ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সদলবলে কুমিল্লা আসেন। তখন সুরেশ বাবুর রচিত গৌরাঙ্গ নাটকটি পুরানো অভয় আশ্রম প্রাঙ্গনে ভার্নাল এর শিল্পীদের দ্বারা মঞ্চস্থ হয়।
কুমিল্লার সাথে কবি গুরু রবি ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে কাজী নজরুলের স্মৃতি কুমিল্লাতেই সবচেয়ে বেশি। কবির প্রেম, পরিণয়, বিরহ, কারাবরন সবই কুমিল্লায়। হেমপ্রভা মজুমদার, বসন্ত কুমার মজুমদারদের সাথে কুমিল্লাতে তিনিও স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন তুমুলভাবে। ওস্তাদ জানে আলম, ওস্তাদ মোহাম্মদ খসরু, শচীন কর্তার বাড়ীতে তিনি নিয়মিত বসাতেন আড্ডার আসর।
 ত্রিপুরা রাজ পরিবার এবং রবিঠাকুর অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। প্রথমে বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুর পরবর্তীতে তদীয় পুত্র রাধাকিশোর মানিক্য বাহাদুরের সাথে রবিঠাকুরের ছিল নিবিড় স্মৃতি। অভয় আশ্রমে তিনি একাধিকবার এসেছেন, সভাপতিত্ব করেছেন অভয় আশ্রমের অনুষ্ঠানে, টাউন হলে বক্তব্য রেখেছেন কুমিল্লার সূধী সমাজের উদ্দেশ্যে, রাত্রি যাপন করেছেন রাণী কুটিরে। আগত শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে উত্তরের বারান্দায় বসে স্বকন্ঠে গেয়েছেন “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে” গানটি। আপ্যায়িত হয়েছেন নবাব হোচ্ছাম হায়দারের বাড়ী এবং ব্যাংকার ইন্দুভূষন দত্তের কৈলাশ ভবনে। বিপ্লবী অতীন রায় রবিঠাকুর কে এত বেশি প্রভাবিত করেছিল তিনি অতীন রায় কে নিয়ে একটি চরিত্রও সৃষ্টি করেছিলেন।
কুমিল্লা প্রথাগত বিধিবদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা কর্মসূচী কখন শুরু হয় এব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও চট্টগ্রামকে আসামের সাথে অর্ন্তভূক্ত করার যে সরকারী পরিকল্পনা হয় তার প্রতিবাদে ১৯০১ সনে খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা কুমিল্লা টাউন হল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়, এই তথ্য আমরা পাই।
আরও দেখুন
Geographic Reference
City & Local Guides
Maps

আমরা জানি ১৮৬২ সন থেকে এদেশে পার্লামেন্টের যাত্রা শুরু। যদিও সে পার্লামেন্ট ছিল বৃটিশদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও মনোনীত। সেই পার্লামেন্টে কুমিল্লা শহর থেকে ১৯০১ সনে জেলার প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েট খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের প্রথম সদস্য নির্বাচিত হন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯০৯ সনে সৈয়দ হোচ্ছাম হায়দার এবং রায় বাহাদুর অনঙ্গ মোহন নাহা, ১৯১৬ সনে অখিল দত্ত, ১৯২১ সনে কাজী গোলাম মহিউদ্দিন ফারুকী এবং শাহ সৈয়দ এমদাদুল হক, ১৯২৩ সনে কাজী গোলাম মহিউদ্দিন ফারুকী, শাহ সৈয়দ এমদাদুল হক এবং মৌলভী অছিমউদ্দিন আহমদ। ১৯২৬ সনে মৌলভি অছিম উদ্দিন আহমদ, অখিল চন্দ্র দত্ত, রায় বাহাদুর প্রসন্ন কুমার দাশ গুপ্ত, দুর্গাদাস দত্ত নির্বাচিত কিংবা মনোনীত হন। এমনিভাবে ১৯৩৭ সনের নির্বাচন পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্রগতিশীলদেরই জয়জয়কার ছিল
ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প ক্ষেত্রে কুমিল্লার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। আমাদের খাদি শিল্প তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এ ব্যাপৃত। ১৬৬০ সালে ভ্যান্ডেন ব্রুক প্রণীত মানচিত্রে ময়নামতি পাহাড়ের পাদদেশে মারা বন্দর নামে একটি নৌবন্দরের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্যে সমৃদ্ধ না হলে এখানে এত সমৃদ্ধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠা এবং দ্রুত বিকশিত হওয়া সম্ভব ছিল না।
অনেক ইতিহাস চাপা পড়ে যাচ্ছে। ভাষা সংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আলোচনায় পুত্র সঞ্জীবদত্ত, দিলীপ দত্ত, নাতিন এ্যারোমা দত্ত দিয়েই আমরা শেষ করি, কিন্তু শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মেয়ে মনীষা পুরকায়স্থ এখনো জীবিত আছেন এই খবর কি আমরা কেউ রাখি না যোগাযোগের চেষ্টা করেছি? সরকারের কি উচিত নয় এই গর্বিত উত্তরাধিকারকে দেশে এনে সম্মানীত করা? ১৮৮৩ সনে প্রকাশিত ত্রিপুরা হিতৈষী পত্রিকাটি ১৯২৪ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত উর্মিলা সিংহের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। উর্মিলা সিংহ দেশের প্রাচীনতম নারী সম্পাদকদের মাঝে অন্যতম এই খবরটি কি আমরা নতুন প্রজন্মের মাঝে পৌঁছাতে পেরেছি? তালপুকুর পাড়ের বিখ্যাত সেন পরিবারের সুধীর সেন, সুধা সেন, মাখন সেন কিংবা সিংহ পরিবারের গুরুদয়াল সিংহের নাম আমরা কজনাই জানি! আমরা ভুলে যাই উল্লাসকর দত্ত নামে কেউ এদেশে ছিলেন। তাঁর পিতা ১৮৮০-৮১ সালের জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক পন্ডিত দ্বিজদাশ দত্তের কথা জিলা স্কুলের ছেলেরাই জানে না। আমরা মাষ্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে অস্ত্রাগার লুন্ঠনের কথা বলি। কিন্তু এ লড়াই এ শহীদ হওয়া কুমিল্লা শহরের ত্রিপুরা সেনগুপ্ত এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লেসিয়ারার বিধুভূষন ভট্টাচার্যের নাম মুখেই আনি না। মাষ্টার দার নির্দেশে ১৯৩২ সনে কুমিল্লার ভারপ্রাপ্ত এসপি এলিসন কে হত্যা করেন বিপ্লবী শৈলেশ রায়। সেই শৈলেশ রায়ের পরিচয় খুঁজে বের করতে আমাদের কে ৮৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। পলাশীর প্রান্তরে ভিনদেশী নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে আমরা এখনও অশ্রু বারিপাত করি অথচ এই ভূমির সন্তান ত্রিপুরাধিকারী শমশের গাজী কে শমশের ডাকাত বলি। কি বিচিত্র আমাদের মানসিকতা।
 আমরা দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসীনের কথা বলি অথচ দানশীলতার মহৎ উদাহরণ মহেষচন্দ্র ভট্টাচার্যের নামই জানি না। আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভিত স্থাপন কিন্তু আমাদের টাইগার গণির হাত ধরেই সম্পন্ন হয়েছিল। আমরা রামের লংকা বিজয়ের খবর রাখি কিন্তু আমাদের বীর পুরুষ শমশের গাজীর ত্রিপুরা জয়ের খবর রাখি না। চট্টগ্রামের কদম মোবারক মসজিদ এবং ঢাকার হোসেনী দালানের সাথেও জড়িয়ে আছে শমশের গাজীর স্মৃতি। ভারতআচার্য প্রসন্নকুমার আচার্যের নাম জানি কিন্তু একথা জানিনা তিনি কুমিল্লার সন্তান, কুমিল্লা জিলা স্কুলের ছাত্র।
আরও দেখুন
City & Local Guides
Maps
Geographic Reference

এই কুমিল্লার সন্তান রমেন চক্রবর্তী শান্তি নিকেতনে চারুকলার শিক্ষক ছিলেন। পরে তিনি ১৯৪৮ সনে কলকাতা আর্ট ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। আমাদের চারুকলা শিল্পীদের কখনও শুনিনি রমেন চক্রবর্তীর নাম উচ্চারন করতে। বাংলা ভাষার কথা বললেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম সবার আগে এসে যায়। আবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কথা বললে স্বভাবিকভাবেই কুমিল্লার আরেক সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের নাম আসবে কিন্তু যেটি আমরা বলি না সেটি হচ্ছে আদালত প্রতিষ্ঠার পর ফার্সি ভাষায় আদালতের সওয়াল জবাব অনুষ্ঠিত হত। কুমিল্লা বারে সর্বপ্রথম মোহীনি মোহন বর্ধণের উদ্যেগে বাংলা ভাষার সওয়াল জবাব শুরু হয়।
একুশকে ঘিরে কুমিল্লা পৌরপার্কের জামতলায় তিননদী পরিষদ গত চল্লিশ বছর যাবত ২১দিনব্যাপী নিরবিচ্ছিন্নভাবে যে অনুষ্ঠানটি করে যাচ্ছে সেটিও একদিন ইতিহাসের অংশ হবে আমি নিশ্চিত।

এখানে একটি কথা না বললেই নয় আজকে শহর কুমিল্লা বা নগর কুমিল্লার যে বিকাশ সমৃদ্ধি তার পেছনে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সহ পাশ^বর্তী এলাকা সমূহের সেটেলারদের অবদান অনেক। কুমিল্লা শহরে আমি এমন কোন পরিবার খুজে পাইনি যারা ৫০০ বছর ধরে কুমিল্লায় বসবাস করেন। কুমিল্লাকে যারা ঋদ্ধ করেছেন যাদের কারনে কুমিল্লা গর্ব অনুভব করে তাদের একটা বড় অংশই ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে কুমিল্লায় আবাস গড়েছেন। কুমিল্লা শহরের প্রতিষ্ঠিত পরিবার গুলোর মাঝে নবাব বাড়ীর বশরত উল্লা কসবা শাহপুর থেকে নবাব কেজিএম ফারুকীর দাদা আফতাব উদ্দিন ও দারোগা বাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান রেয়াজ উদ্দিন নবীনগর রতনপুর থেকে কুমিল্লার ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ স্বামী ও ব্যাংকার নরেনদত্ত সরাইলের কালিকচ্ছ থেকে পন্ডিত দ্বিজদাস দত্ত কালিকচ্ছেরই সন্তান। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত রামরাইল থেকে, মোহিনী মোহন বর্ধণ সরাইলের গৌতম পাড়া থেকে, দানবীর মহেশ ভট্টাচার্য্য বাহ্মনবাড়ীয়ার বীটঘর থেকে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড যার ভূমির উপর দাড়িয়ে আছে সেই অখিল দত্ত কসবা চারগাছ থেকে, রাজনীতিবিদ হাবিবুর রহমান কসবা গোপীনাথপুর থেকে, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর পিতা জয়নুল হোসেন কসবা মঈনপুর থেকে, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ শিবপুর থেকে, খানবাহাদুর ফরিদ উদ্দীন পৈরতলা থেকে, নবাব সিরাজুল ইসলাম নবীনগর পেয়ারকান্দি থেকে, অনঙ্গ নাহা নবীনগর থেকে এসে কুমিল্লা শহরে বসত স্থাপন করেন। অজিতগুহের দাদা মদন মোহন গুহ বিক্রমপুর থেকে সোনারং কম্পাউন্ডের প্রতিষ্ঠাতাদের আদি নিবাসও বিক্রমপুর। দেশওয়াল পরিবার ও গিরিধারী পরিবারের চলে যাওয়ার পর দেশওয়ালী পট্টির অধিকাংশ পরিবারেরই আদি নিবাস বিক্রমপুর। আবার নবাব পরিবারের সদস্যরা চর্থা, বজ্রপুর, বাগিচা গাও সহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় বসত গড়েন। এমন কি সুদূর ফ্রান্স থেকে ডেলনী পরিবার এবং কুর্জন পরিবার উত্তর ভারত থেকে আগত ক্ষেত্রি পরিবার, তিলক সিং এর পরিবার এখানে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন।
আরও দেখুন
City & Local Guides
Maps
Geographic Reference

সেই কুমিল্লার আজ কি হাল হকিকত একথা কমবেশী আমরা সবাই জানি। আধুনিকতার ইতিবাচক দিকের চাইতে নেতিবাচক দিকই এখানে গেড়ে বসেছে।
একদা পুকুরের শহর কুমিল্লার শত শত পুকুর ভরাট হয়েছে আরো আগেই, এখন নজর দীঘির প্রতি। পরিচ্ছন্ন শহর এখন আবর্জনার ভাগাড়। বার্ধ্যকের মত অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত প্রাণের শহর প্রিয় জনপদ। তবে এখনও চাইলেই ঘুরে দাড়াঁনো সম্ভব বলে আমি বিশ^াস করি। সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগুলে কুমিল্লা হতে পারে দেশের অন্যতম নান্দনিক শহর। ফিরিয়ে আনতে পারে তার হারানো ঐতিহ্যকে।

শহর সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবী। মূল শহরকে কেন্দ্রে রেখে চারিদিকে কুমিল্লা শহরকে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এতে করে যানজট আর জলজট এর পাশাপাশি যে জনজট তৈরী হয়েছে তা অনেকটাই কমে আসবে বলে আমার ধারনা। পর্যটনে রয়েছে কুমিল্লার অপার সম্ভাবনা। লালমাই ময়নামতি পাহাড়কে ঘিরে একটি পর্যটন হাব তৈরী করা যেতে পারে। ধর্মসাগরের নৈসর্গিক সুষমা মন্ডিত আদি রূপটি ধরে রাখতে হবে। ঐতিহ্যবাহী স্থাপন সমূহ সংরক্ষণ করতে হবে নতুন প্রজন্মের জন্য। সম্প্রসারিত শহরে কর্মমূখী বিশ^বিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশেষ করে হার্ট ফাউন্ডেশন, ক্যান্সার হাসপাতাল, সিআরবি এর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনিয়তা তীব্র।পুরাতন গোমতী নদীকে ঘিরে হাতিরঝিলের আদলে একটি প্রকল্প শহরের সৌন্দর্য বর্ধনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
বৈশি^ক অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে কুমিল্লায় আইটিপার্ক করার মত স্থান এবং মেধা সবই আছে, দরকার শুধু সৎ উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। ঐতিহ্যের খাদি শিল্পকে ঘিরে খাদিপল্লী স্থাপনের মাধ্যমে বস্ত্র শিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার গোটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য আমাদের মাহাথীর কিংবা লিকুয়ানের প্রয়োজন নেই প্রয়োজন একজন আখতার হামিদ খানের মত সৎ ,দক্ষ ও মেধাবী প্রশাসক। বিদ্যার্নব রাসমোহন চক্রবর্ত্তীর মত নির্মোহ বিদগ্ধ পণ্ডিত, সর্বোপরি জনসাধারণের সক্রিয় সমর্থন ও অংশগ্রহণ।  

তাই আসুন আমরা সবাই মিলে জাগিয়ে তুলব কুমিল্লার এই তন্দ্রাভিভূত আত্মাকে। তাই আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলব অলকানন্দার উৎস স্থল কুমিল্লা কে। এই স্বপ্নগুলো কি আদৌ বাস্তবায়িত হবে? নাকি অতীতের মতই কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের রোষানলে পড়ে সংকীর্নমনা দেউলিয়া রাজনীতির থাবায় হারিয়ে যাবে। আর আমার মত কল্পনাবিলাসীরা চিরকালই অলস চিন্তার রঙ্গীন স্বপ্নজাল বুনে এবং কন্টকিত কাল্পনিক নিবন্ধ লিখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে থাকব। আমাদের কথাগুলো কি অরণ্যে রোদন হয়েই থাকবে? এর জবাব উত্তরকালের জন্য জমা রইল।



[লেখক পরিচিতি ঃ সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্র্মী।

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.