ব্রিব্রিটিশ মন্ত্রী-মুরাদনগরের কামিনী কুমার দত্ত লেখক: মমিনুল ইসলাম মোল্লা

 


ব্রিটিশ মন্ত্রী-মুরাদনগরের কামিনী কুমার দত্ত 

কামিনী কুমার দত্ত ১৮৭৮ সালের ২৫ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কৃষ্ণকুমার দত্ত ছিলেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট হাইস্কুলের প্রধান পণ্ডিত। শিক্ষিত পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তিনি ছোটবেলা থেকেই বিদ্যা ও প্রজ্ঞায় পারদর্শী হন। চট্টগ্রাম সরকারি হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯০১ সালে কামিনী কুমার দত্ত কুমিল্লা জেলা বারে আইনচর্চা শুরু করেন। স্বল্পকাল সরকারি মুন্সেফ হিসেবে কাজ করার পর স্বাধীনভাবে আইন পেশায় ফিরে আসেন। ১৯১৮ সালে কলকাতা হাইকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করে বিচারক ও সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সম্মান অর্জন করেন।

রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বামপন্থি নেতা হিসেবে স্বদেশী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। এ সময় একাধিকবার গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হলেও ন্যায় ও স্বাধীনতার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং কংগ্রেস সংসদীয় দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৩৮ সালে কুমিল্লা শহরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। নিখিল ভারত কিষাণ সমিতি ও অন্যান্য কৃষক নেতাদের সঙ্গে তিনি কৃষকদের অধিকার ও মুক্তি প্রসারে কাজ করেন। একই সঙ্গে তিনি কুমিল্লায় বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন, অভয় আশ্রম ও সামাজিক কল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের মূলনীতি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য এবং ১৯৫৫–৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি সক্রিয় ছিলেন ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।

কামিনী কুমার দত্ত সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজেও বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি কুমিল্লার অভয় আশ্রম, মৃণালিনী ছাত্রীনিবাস ও শ্রীকাইল কলেজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ছিলেন। তার নেতৃত্বে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ পরিচালিত হয়। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদাহরণ হিসেবে জনমানুষের কাছে সমাদৃত।

কামিনী কুমার দত্তের ব্যক্তিগত জীবনও অত্যন্ত সাদাসিধে ও নৈতিকতাবোধপূর্ণ ছিল। তিনি তাঁর পরিবার ও পুত্রকন্যাদের শিক্ষায় গভীর মনোযোগ দিতেন এবং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতার আদর্শ স্থাপন করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তার স্ত্রী মৃণালিনী দত্তের নামে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রীনিবাস আজও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১৯৫৯ সালের ৪ জানুয়ারি কুমিল্লায় ৮১ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর জীবনের সংগ্রাম, নেতৃত্ব, সমাজকল্যাণ ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ আজও দুই বাংলার মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। কামিনী কুমার দত্ত ছিলেন আইন, রাজনীতি ও সমাজসেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যার আদর্শ ও কর্মপন্থা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষনীয় ও অনুসরণযোগ্য।

লেখক: মমিনুল ইসলাম মোল্লা

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.