মুক্তিযুদ্ধে দেবিদ্ধার


মুক্তিযুদ্ধে দেবিদ্বার

দেবিদ্বারে মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী প্রশিক্ষণ ক্যাম্প…….
Tuesday, February 11, 2020 208 Time View

মোমিনুল ইসলাম দেবিদ্বার উপজেলাস্থ ৬নং ফতেহাবাদ ইউনিয়ন এর ফতেহাবাদ গ্রামে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘নলআরা’য় প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের স্থানটিকে স্মরণীয় করে রাখতে স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণ কল্পে মুক্তিযোদ্ধা ও সূধী সমাবেশ এর আয়োজন করা হয়েছে। ১০/০২/২০২০ইং সোমবার সকাল ১০টায় দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ও ইতালী প্রবাসী মোঃ মুখলেসুর রহমান সরকার এর সার্বিক সহযোগীতায় ফতেহাবাদ গ্রামের মোকামবাড়ি ঈদগাহ মাঠে ওই মুক্তিযোদ্ধা ও সূধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশের শুরুতে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পূষ্পর্ঘ্য অর্পণ করেন উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, উপজেলা প্রেসক্লাব সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ব্যাক্তিবর্গ। উপজেলা প্রেসক্লাব সভাপতি সৈয়দ খলিলুর রহমান বাবুল এর সভাপতিত্বে এবং সাইফুল ইসলাম মিঠু মূন্সী’র সঞ্চালনায় উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব
১৯৭১ সলের রক্তে ঝরা দিনগুলোতে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমনে হানাদার মুক্ত হয়েছিল কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল। তারই ধারাবাহিকতায় দেবিদ্বার এলাকা হানাদার মুক্ত হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে ওইদিন হানাদারদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা করে। ৩ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ সেতুটি মাইন বিষ্ফোরনে উড়িয়ে দেয়। মিত্রবাহিনীর ২৩ মাউন্ড ডিভিশনের মেজর জেনারেল আর.ডি বিহারের নেতৃত্বে বৃহত্তর কুমিল্লায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। মিত্রবাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে দেবিদ্বারে আসে। হানাদাররা ওই রাতেই দেবিদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা সেনানিবাসে পালিয়ে যায়। ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ দেবিদ্বার সদরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এরই মধ্যে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক বহরটি দেবিদ্বার থেকে চান্দিনা রোডে ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার সময় মোহনপুর এলাকায় ভুল বোঝাবুঝির কারনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গুলি বিনীময় হলে মিত্রবাহিনীর ৬ সেনা সদস্য নিহত হয়। এই দিনে দেবিদ্বারের উল্লাসিত জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে বিজয় উল্লাসে ‘জয়বাংলা’মেতে উঠে। দুপুর পর্যন্ত ওইদিন হাজার হাজার জনতা বিজয় উল্লাসে উপজেলা সদর প্রকম্পিত করে তোলে

৩১মার্চ রাজধানী সহ বিভাগীয় শহরের বাইরে শত্রু সেনাদের সাথে সন্মূখ যুদ্ধে প্রাণ বাজি রেখে বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরবময় অধ্যায় প্রথম থেকেই দেবিদ্বারে দানা বাঁধতে শুরু করে।


ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার কসবা এলাকায় নারকীয় এক হত্যাজজ্ঞ চালিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫ সদস্যের একটি পাক সেনার দল, পায়ে হেঁটে ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়ক হয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি বর্তমান কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসের দিকে যাত্রা শুরু করে। ৩১ মার্চ কাক ডাকা ভোরে ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়কের দেবিদ্বার উপজেলার ভিংলাবাড়ি নামক স্থানে ওই হায়ানার দলটি জনতা কর্তৃক প্রথম অবরুদ্ধ হয়। পাক সেনারা ধাওয়া খেয়ে দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামে ঢুকে এক গৃহবধূর শ্লীলতা হানীর চেষ্টাকালে আবুল কাসেম নামে এক যুবক ইট দিয়ে আঘাত করলে পাক সেনাদের গুলিতে তিনি প্রথম শহীদ হন। বিক্ষুব্ধ জনতা দেবিদ্বার থানার অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে ওই অস্ত্র এবং বঙ্গজ হাতিয়ার লাঠি, দা, সাবল এমনকি মরিচের গুড়া নামক অস্ত্রটিও ব্যবহার করেছিল


সেদিন শত্রুসেনারা বারেরা কোড়েরপাড় পৌছার পর হালচাষরত কৃষক সৈয়দ আলী শত্রুসেনাদের দেখে হাতের পাজুন দিয়ে পাক সেনাদের পেটাতে থাকে, পাকসেনাদের গুলিতে সহকর্মী মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে আব্দুল


মজিদ ঝাটা নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে বরন করে হায়ানাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে শহীদ হন। এমনি করে ভিংলাবাড়ি থেকে জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ পর্যন্ত পনের কিলোমিটার পথে হাজার হাজার নিরস্ত্র ও সশস্ত্র বাঙ্গালীর সাথে পাক হায়ানাদের দিনব্যাপী যুদ্ধে পথিমধ্যে আট পাকনোকে হত্যাপূর্বক মাটিতে পুতে ফেলে এবং জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদে আশ্রয় নেয়া অবশিষ্ট সাত জনকে হত্যাপূর্বক বস্তা বন্দি করে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরবর্তীতে প্রখ্যাত রাজাকার আফসু রাজাকার এবং আলী আহাম্মদ রাজাকারের নেতৃত্বে এ এলাকাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ‘ভিংলাবাড়ি- জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধ’ খ্যাত ওই যুদ্ধে আবুল কাসেম, সৈয়দ আলী, আব্দুল মজিদ, তব্দল ড্রাইভার, মমতাজ বেগম, সফর আলী, নায়েব আলী, সাদত আলী, লালমিয়া, ঝারু মিয়া, আব্দুল ড্রাইভার, ফরিদমিয়া, আব্দর রহিমসহ ৩৩বাঙ্গালী শহীদ হয়েছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে রাজধানী, বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাইরে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত পাক বাহিনীর একটি পুরো দলকে পরাস্ত করে নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব সম্ভবতঃ এটাই বাংলাদেশে প্রথম।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টামন্ডুলীর বর্তমানে একমাত্র জিবীত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত ‘বিশেষ গেরিলাবাহিনী’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড আব্দুল হাফেজ, পালাটোনা ক্যাম্প প্রধান কিংবদন্তী যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, মুক্তি যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আজগর হোসেন মাষ্টার, সাবেক এমএনএ আব্দুল আজিজ খান, শহীদ নুরুল ইসলাম, শহীদ শাহজাহানসহ অসংখ্য কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধার অবদান ছিল স্মরনীয়।
১৪ এপ্রিল সমতট রাজ্যের রাজধানী খ্যাত এবং হিন্দু অধ্যুসিত বরকামতা গ্রামে পাক হানাদাররা হামলা চালানোর সংবাদে কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল হাফেজের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ হাজার বাঙ্গালী মাত্র দুটি থ্রী-নট থ্রী রাইফেল ও লাঠি নিয়ে শত্রুসেনাদের উপরঝাপিয়ে পড়ে। রাইফেলের গুলিতে এক প্লাটুন সৈন্যেও পাঁচজন লুটিয়ে পড়লে কিংকর্তব্য বিমূঢ় পাক সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ওই রাতে ফিরে এসে হিং¯্র হায়ানারা লুটপাট, নির্যাতনসহ অগ্নীসংযোগে পুরো গ্রামটি জ¦ালিয়ে ছারখার করে দেয়।

২৪জুন মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার বাখরাবাদ গ্রামে পাক হায়ানাদেও এক নারকীয় হত্যাজজ্ঞে অগ্নীসংযোগ লুটপাট, নারী নির্যাতনসহ ২৪০ নিরীহ বাঙ্গালীকে নির্মমভাবে হত্যা কওে এবং ওই দিন ২১যুবককে ধরে দেবিদ্বার ক্যাম্পে আনার পথে একজন পালিয়ে গেলেও অপর ২০জনকে দেবিদ্বার সদরে পোষ্ট অফিস সংলগ্নে ধৃতদের কর্তৃক গর্ত খুড়ে চোখ বেঁধে ব্রাস ফায়াওে হত্যা কওে একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলে বাকী ১৯জনকে ওই গর্তে চাপা দেয়া হয়। দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক দীর্ঘ আন্দোলনের পর গত আগষ্ট মাসে ওই বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মান করা হয়।

৪ ডিসেম্বর কুমিল্লর দেবিদ্বার মুক্ত দিবস। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের যে কয়টি স্থান বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য দেবীদ্বার তার অন্যতম।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস অতি সন্নিকটে হওয়াতে দেবীদ্বার ছিল অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। খুব সহজেই হানাদাররা দেবীদ্বার আক্রমণ চালাতে পারতো। এ কারনে এখানকার নিরীহ বাঙালি নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলো। আবার এসব কারনেই দেবীদ্বারবাসীকে হতে হয়েছিলো তীব্র প্রতিরোধী। স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ছোঁয়া লাগেনি এমন গ্রাম দেবিদ্বারে নেই। সংগ্রামে দেবিদ্বার বাসীর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আপামর জনতা। যুদ্ধে বারেরা গ্রামের ৩৩ জন, বারুর গ্রামের ৭ জন শহীদ হন। সেদিন ধামতী ও ভূষনা গ্রামের ৬জন নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো হানাদাররা। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারদের বরবরতার আরেকটি নির্মম স্বাক্ষর দেবিদ্বারের ‘গণকবর’। উপজেলা সদরে ১৯ জন বাঙ্গালীকে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।


৬ সেপ্টেম্বর রাজাকারদের সহযোগীতায় পাক হায়ানারা বারুর গ্রামে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিলে মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি দল সম্মূখ সমরে জয়নাল আবেদীন, বাচ্চুমিয়া, শহিদুল ইসলাম,আলী মিয়া, আব্দুস সালাম, সফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ হোসেনসহ ছয় মুক্তিযোদ্ধা শাদাত বরণ করেন ভাগ্যক্রমে অপর একজন বেঁেচ যান।

১৯৭১’সালের ৬ সেপ্টেম্বর দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের বারুর গ্রামে পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওই যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের সাথে ‘যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথন’নিয়ে এক মত বিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।‘যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথন’-এ স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। সহযোদ্ধাদের হারানোর বর্ননা দিতে যেয়ে অনেকে কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

তারা বারুর যুদ্ধের বর্ণনা দিতে যেয়ে বলেন, ১৯৭১’ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তে ঝরা দিনগুলোতে ৬ সেপ্টেম্বর বারুর গ্রামে পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মূখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, ওই সম্মূখ যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদিন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলী মিয়া, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম খান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল ইসলাম সহ ৫ মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামের নিরিহ বাঙ্গালী শহীদ গণিমিয়া, শহীদ ওমেশ চন্দ্র শীল, শহীদ লাল মিয়া সহ একই দিনে ৮জন শহীদ হন। অপর ঘটনায় ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর কালিকাপুর আফসু রাজাকার বাহিনীর প্রধান আফসর উদ্দিন রাজাকার হত্যা অভিযানে বারুর গ্রামের আরো দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বাচ্চু মিয়া ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম মোল্লা শহীদ হন।


অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান বলেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর, বধ্যভুমি ও কবরগুলো সংরক্ষণ এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ কাজগুলো ৫০বছর পরে নয়, আগে হলে ভালো হত। নতুন প্রজন্মের মানুষগুলো আগেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারত। স্বাধীনতা বিরোধীরা এখনো স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারছেনা। তাদের প্রতি একরাশ ঘৃণা। তাই আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গল্পগাঁথা জানাতে শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে।


স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘অনিক এন্টার প্রাইজ’র পরিচালক ও ছাত্রলীগ কুমিল্লা উত্তর জেলা সভাপতি আবু কাউছার অনিক বলেন, দু’টি যুদ্ধে শহীদ ১০জন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৩ লক্ষ টাকা ব্যায়ে একটি ৩ স্তম্ভের স্মৃতিফলকও নির্মান করা হচ্ছে। যা আগামী ২০২১ সালের জানুয়ারী মাসেই উদ্বোধন করা হবে। স্মৃতি ফলকে আগামী প্রজন্মকে জানান দিতে বারুর গ্রামের ১০ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম ও বারুর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হবে।ভূষণা গ্রামকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাটি হিসাবে চিহ্নীত করে পাক হায়ানাদেও একটি বিশাল বাহিনী ২৯নভেম্বর হামলা চালায়। ভূষণা গ্রামের ষোলটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। পাক হায়ানারা ভূষণা গ্রামের ছয় নিরিহ বাঙ্গালী 

এছাড়াও পোনরা গ্রামে (নরসিংদী জেলার) মুক্তিযোদ্ধা আবুবকর, ভিড়াল্লা গ্রামের শহীদ মজিবুর রহমানের কবর পথিকের হৃদয় এখনো আলোড়িত করে।ধামতী গ্রামকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাটি হিসাবে চিহ্নীত করে পাক হায়ানাদেও একটি বিশাল বাহিনী ২৯নভেম্বর হামলা চালায়। ধামতী গ্রামের বিখ্যাত চৌধূরী বাড়িসহ নব্বইটি বাড়ি, জ্বালিয়ে দেয়। পাক হায়ানারা ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় পীর আজিমউদ্দিন সাহেবের নাতি শরিফুল্লাহ, অধ্যক্ষ হালিম হুজুরের দু’ভাগ্নে জহুর আলী ও আব্দুল বারি, সহোদও তাজুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামকে তাদেও স্বজনদেও সামনে নির্মমভাবে গুলি কওে হত্যা করে।কুমিল্লাকে হায়েনা মুক্ত করতেও মরিয়া হয়ে উঠে এ অঞ্চলের বীর যোদ্ধারা। প্রথমে মুক্তি বাহিনী মিয়াবাজার থেকে সুয়াগাজীতে কোম্পানী কমান্ডারের সঙ্গে একত্রিত হয়। পরে সুয়াগাজী হয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকে মুক্তি বাহিনী। কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা ইন্ডিয়ান ৪র্থ কোরের ৫৭ ও ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কে ও এস ফোর্স সম্মিলিতভাবে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ইন্ডিয়ান ৪র্থ কোরের ২৩ মাউণ্টেন ডিভিশনের মেজর জেনারেল আর ডি হিরার নেতৃত্বোধীন ভারতীয় মিত্রবাহিনী সদস্যদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা ৭ ডিসেম্বর রাতে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে কুমিল্লাকে। সবার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ৮ ডিসেম্বর মুক্ত হয় কুমিল্লা।মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ: মিরপুর থেকে জাফরগঞ্জ মসজিদ পর্যন্ত


মিরপুর হত্যাযজ্ঞের সূচনা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা ও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মিরপুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় বাঙালিদের হাতে একজন পাক সেনা নিহত হয়। এরপর বাকি ১৪ জন সেনা পায়ে হেঁটে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক ধরে ময়নামতি সেনানিবাসের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।  


ভিংলাবাড়িতে অবরুদ্ধ পাক সেনারা

৩১ মার্চ ভোরে ভিংলাবাড়ি এলাকায় ওই সেনারা স্থানীয় জনতার হাতে অবরুদ্ধ হয়। মুহূর্তেই ভিংলাবাড়ি, বড় আলমপুর, চাপানগর, দেবীদ্বার, ছোট আলমপুর, বিনাইপাড়, ফতেয়াবাদ, বিজলীবাজার ও মরিচাকান্দা গ্রামের হাজারো মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেয়। এতে ১৪ জন পাক সেনা নিহত হয় এবং ৫ জন মুক্তিকামী শহীদ হন।  


জাফরগঞ্জ শ্রীপুরপাড় জামে মসজিদে সমাপ্তি

অবরুদ্ধ সেনাদের একটি অংশ জাফরগঞ্জ শ্রীপুরপাড় জামে মসজিদে আশ্রয় নেয়। স্থানীয় জনতা তাদের হত্যা করে দুজনকে মাটিতে পুঁতে ফেলে এবং পাঁচজনের লাশ গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এভাবেই মিরপুর থেকে শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞ ও প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা শেষ হয় জাফরগঞ্জ মসজিদে।  


---


উপসংহার

মুক্তিযুদ্ধের এই অধ্যায়ে দেখা যায়, কীভাবে মিরপুরে শুরু হওয়া পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞ ভিংলাবাড়ি হয়ে জাফরগঞ্জ মসজিদে এসে শেষ হয়। সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ ও মুক্তিকামী যোদ্ধারা একত্রে প্রতিরোধ গড়ে তুলে অসীম সাহসের পরিচয় দেন। এই ধারাবাহিক সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।  মহেশপুর গণহত্যা: একাত্তরের ১৭ সেপ্টেম্বর এক বর্বরতার কালো অধ্যায়
দেবীদ্বার (কুমিল্লা): একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া অসংখ্য গণহত্যার মধ্যে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার মহেশপুর গ্রামে সংঘটিত এক নির্মম হত্যাকাণ্ড আজও ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের হাতে ৬০ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন, যা ইতিহাসে ‘মহেশপুর গণহত্যা’ নামে পরিচিত।
যেভাবে শুরু হলো বর্বরতা
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ময়নামতি ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে এসে মুরাদনগর ও দেবীদ্বারের বিভিন্ন গ্রামে টহল দিতো। তারা স্থানীয় রাজনৈতিক দালালদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান করতো এবং সাধারণ মানুষের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতো। এ সময় রাজাকাররা বিভিন্ন গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং নারী নির্যাতন করতো। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তাদের নৃশংসতা ছিল সীমাহীন। প্রাণের ভয়ে অনেক হিন্দু গ্রামবাসী দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মহেশপুর
আশেপাশের গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে মুরাদনগরসহ বিভিন্ন এলাকার লোকজন কিছুটা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেবীদ্বারের মহেশপুর গ্রামকে বেছে নেয়। গ্রামটি দেবীদ্বার উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার এবং ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন ভালো ছিল না, যা একে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ করে তুলেছিল। তাই অনেক মানুষ এখানে আশ্রয় নিতো এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে শরণার্থী শিবিরে চলে যেত।
গণহত্যার সূত্রপাত
১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মুরাদনগরের বাইরা গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামের কিছু নারী ভারতে শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মহেশপুরের দিকে রওয়ানা দেন। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে সি.এন্ড.বি ব্রিজ পার হওয়ার সময় স্থানীয় রাজাকার লিল মিয়া (লিনা চোর) ও ফজল মিয়ার নেতৃত্বে একদল রাজাকার তাদের আটক করে। তারা মহিলাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নেয়।
এ সময় মহিলারা সম্ভ্রম বাঁচাতে সবকিছু ফেলে মহেশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে আশ্রয় নেন। রাজাকাররা তাদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাকিস্তানি সেনারা মহেশপুর গ্রামে প্রবেশ করে এবং নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। তারা বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে।
সেই দিনের বর্বর হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন আব্দুল বারেক, মজবুর আলী, আব্দুর রাজ্জাক, জাফর আলী, আব্দুল জলিল (দুলু মিয়া), আনু মিয়া, শামসু মিয়া, আব্দুল মালেক, আব্দুল জলিল এবং রাজ্জাক মাস্টারের ভাইসহ মোট 11 জন নিরীহ মানুষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই মহেশপুর গণহত্যা এক গভীর বেদনার চিহ্ন রেখে গেছে।।

লেখক পরিচিতি -মমিনুল ইসলাম মোল্লা, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, কুমিল্লা।।রামপুর গণহত্যা, কুমিল্লা

চান্দিনা থানাধীন মাধাইয়া বাজারের সন্নিকটে (দেবীদ্বার থানা এলাকাধীন) রামপুর গ্রামে রাজাকার আলবদর কর্তৃক মুক্তিকামী এক পুরুষ গণহত্যা সংঘটিত হয়। এ গণহত্যায় যারা শহীদ হয়েছেন তারা হচ্ছেন—
আবদুল আওয়াল রহিম, (২৬ নৌজি), মরিজা হাইস্কুল, দেবীদ্বার, আব্দুল ওয়াহাব মিয়া, আব্দুল আজহার, উমর টেকানী, কানিজপুর, কুমিল্লা, আবুল খায়ের, শফিউল্লাহ সরকার, অনীশ বালা সরকার, মহব্বত আলী, তফজ্জল হোসেন (বয়স ১০-১২)।: গ্রামের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আ. মান্নান হোসেন বাড়ির পাশে তার এক পুত্র তসলাম ও ১ মেয়ে সন্তানকে জিম্মি করে বাড়ির ৩ জনকে হত্যা করা হয়। সেদিন (৩ই নভেম্বর) গ্রামে ৮ জনকে হত্যা করা হয়। মান্নান হোসেনসহ ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, ১ জন গুরুতর আহত অবস্থায় মারা যায়। এ সময় গ্রামে ১৮ জনকে গুম করা হয়। এ সময় আকাশে কোনো বিমান উড়ছিল না

১৯৭১ সলের রক্তে ঝরা দিনগুলোতে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমনে হানাদার মুক্ত হয়েছিল কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল। তারই ধারাবাহিকতায় দেবিদ্বার এলাকা হানাদার মুক্ত হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে ওইদিন হানাদারদের বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা করে। ৩ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ সেতুটি মাইন বিষ্ফোরনে উড়িয়ে দেয়। মিত্রবাহিনীর ২৩ মাউন্ড ডিভিশনের মেজর জেনারেল আর.ডি বিহারের নেতৃত্বে বৃহত্তর কুমিল্লায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। মিত্রবাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুড়িচং ব্রাক্ষনপাড়া হয়ে দেবিদ্বারে আসে। হানাদাররা ওই রাতেই দেবিদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা সেনানিবাসে পালিয়ে যায়। ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ দেবিদ্বার সদরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এরই মধ্যে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক বহরটি দেবিদ্বার থেকে চান্দিনা রোডে ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার সময় মোহনপুর এলাকায় ভুল বোঝাবুঝির কারনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গুলি বিনীময় হলে মিত্রবাহিনীর ৬ সেনা সদস্য নিহত হয়। এই দিনে দেবিদ্বারের উল্লাসিত জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে বিজয় উল্লাসে ‘জয়বাংলা’মেতে উঠে। দুপুর পর্যন্ত ওইদিন হাজার হাজার জনতা বিজয় উল্লাসে উপজেলা সদর প্রকম্পিত করে তোলে।


তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্ট সন্নিকটে থাকায় এঅঞ্চলের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ৩১মার্চ রাজধানী সহ বিভাগীয় শহরের বাইরে শত্রু সেনাদের সাথে সন্মূখ যুদ্ধে প্রাণ বাজি রেখে বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরবময় অধ্যায় প্রথম থেকেই দেবিদ্বারে দানা বাঁধতে শুরু করে।

ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার কসবা এলাকায় নারকীয় এক হত্যাজজ্ঞ চালিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫ সদস্যের একটি পাক সেনার দল, পায়ে হেঁটে ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়ক হয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি বর্তমান কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসের দিকে যাত্রা শুরু করে। ৩১ মার্চ কাক ডাকা ভোরে ‘কুমিল্লা-সিলেট’ মহাসড়কের দেবিদ্বার উপজেলার ভিংলাবাড়ি নামক স্থানে ওই হায়ানার দলটি জনতা কর্তৃক প্রথম অবরুদ্ধ হয়। পাক সেনারা ধাওয়া খেয়ে দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামে ঢুকে এক গৃহবধূর শ্লীলতা হানীর চেষ্টাকালে আবুল কাসেম নামে এক যুবক ইট দিয়ে আঘাত করলে পাক সেনাদের গুলিতে তিনি প্রথম শহীদ হন। বিক্ষুব্ধ জনতা দেবিদ্বার থানার অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে ওই অস্ত্র এবং বঙ্গজ হাতিয়ার লাঠি, দা, সাবল এমনকি মরিচের গুড়া নামক অস্ত্রটিও ব্যবহার করেছিল

সেদিন। শত্রুসেনারা বারেরা কোড়েরপাড় পৌছার পর হালচাষরত কৃষক সৈয়দ আলী শত্রুসেনাদের দেখে হাতের পাজুন দিয়ে পাক সেনাদের পেটাতে থাকে, পাকসেনাদের গুলিতে সহকর্মী মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে আব্দুল

মজিদ ঝাটা নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে বরন করে হায়ানাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন। তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে শহীদ হন। এমনি করে ভিংলাবাড়ি থেকে জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ পর্যন্ত পনের কিলোমিটার পথে হাজার হাজার নিরস্ত্র ও সশস্ত্র বাঙ্গালীর সাথে পাক হায়ানাদের দিনব্যাপী যুদ্ধে পথিমধ্যে আট পাকনোকে হত্যাপূর্বক মাটিতে পুতে ফেলে এবং জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদে আশ্রয় নেয়া অবশিষ্ট সাত জনকে হত্যাপূর্বক বস্তা বন্দি করে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরবর্তীতে প্রখ্যাত রাজাকার আফসু রাজাকার এবং আলী আহাম্মদ রাজাকারের নেতৃত্বে এ এলাকাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ‘ভিংলাবাড়ি- জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধ’ খ্যাত ওই যুদ্ধে আবুল কাসেম, সৈয়দ আলী, আব্দুল মজিদ, তব্দল ড্রাইভার, মমতাজ বেগম, সফর আলী, নায়েব আলী, সাদত আলী, লালমিয়া, ঝারু মিয়া, আব্দুল ড্রাইভার, ফরিদমিয়া, আব্দর রহিমসহ ৩৩বাঙ্গালী শহীদ হয়েছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে রাজধানী, বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাইরে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত পাক বাহিনীর একটি পুরো দলকে পরাস্ত করে নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব সম্ভবতঃ এটাই বাংলাদেশে প্রথম।

এছাড়াও মুক্তি যুদ্ধে দেবীদ্বার বাসীর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টামন্ডুলীর বর্তমানে একমাত্র জিবীত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত ‘বিশেষ গেরিলাবাহিনী’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড আব্দুল হাফেজ, পালাটোনা ক্যাম্প প্রধান কিংবদন্তী যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, মুক্তি যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আজগর হোসেন মাষ্টার, সাবেক এমএনএ আব্দুল আজিজ খান, শহীদ নুরুল ইসলাম, শহীদ শাহজাহানসহ অসংখ্য কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধার অবদান ছিল স্মরনীয়।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট দেবিদ্বারের খুব কাছে থাকার কারনে এ এলাকার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যেমন বেশী ছিল, তেমনি রাজাকারদের সহযোগীতায় এ অঞ্চলে নারকীয় হত্যাজজ্ঞ, লুন্ঠন, নারী নির্যাতন, অগ্নীসংযোগসহ নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে এ এলাকার মানুষ।

১৪এপ্রিল সমতট রাজ্যের রাজধানী খ্যাত এবং হিন্দু অধ্যুসিত বরকামতা গ্রামে পাক হানাদাররা হামলা চালানোর সংবাদে কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল হাফেজের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ হাজার বাঙ্গালী মাত্র দুটি থ্রী-নট থ্রী রাইফেল ও লাঠি নিয়ে শত্রুসেনাদের উপরঝাপিয়ে পড়ে। রাইফেলের গুলিতে এক প্লাটুন সৈন্যেও পাঁচজন লুটিয়ে পড়লে কিংকর্তব্য বিমূঢ় পাক সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ওই রাতে ফিরে এসে হিং¯্র হায়ানারা লুটপাট, নির্যাতনসহ অগ্নীসংযোগে পুরো গ্রামটি জ¦ালিয়ে ছারখার করে দেয়।

২৪জুন মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার বাখরাবাদ গ্রামে পাক হায়ানাদেও এক নারকীয় হত্যাজজ্ঞে অগ্নীসংযোগ লুটপাট, নারী নির্যাতনসহ ২৪০ নিরীহ বাঙ্গালীকে নির্মমভাবে হত্যা কওে এবং ওই দিন ২১যুবককে ধরে দেবিদ্বার ক্যাম্পে আনার পথে একজন পালিয়ে গেলেও অপর ২০জনকে দেবিদ্বার সদরে পোষ্ট অফিস সংলগ্নে ধৃতদের কর্তৃক গর্ত খুড়ে চোখ বেঁধে ব্রাস ফায়াওে হত্যা কওে একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলে বাকী ১৯জনকে ওই গর্তে চাপা দেয়া হয়। দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক দীর্ঘ আন্দোলনের পর গত আগষ্ট মাসে ওই বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মান করা হয়।

৬সেপ্টেম্বর রাজাকারদের সহযোগীতায় পাক হায়ানারা বারুর গ্রামে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিলে মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি দল সম্মূখ সমরে জয়নাল আবেদীন, বাচ্চুমিয়া, শহিদুল ইসলাম,আলী মিয়া, আব্দুস সালাম, সফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ হোসেনসহ ছয় মুক্তিযোদ্ধা শাদাত বরণ করেন ভাগ্যক্রমে অপর একজন বেঁেচ যান।

ভূষণা ও ধামতী গ্রামকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাটি হিসাবে চিহ্নীত করে পাক হায়ানাদেও একটি বিশাল বাহিনী ২৯নভেম্বর হামলা চালায়। ধামতী গ্রামের বিখ্যাত চৌধূরী বাড়িসহ নব্বইটি বাড়ি, ভূষণা গ্রামের ষোলটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। পাক হায়ানারা ভূষণা গ্রামের ছয় নিরিহ বাঙ্গালী ও ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় পীর আজিমউদ্দিন সাহেবের নাতি শরিফুল্লাহ, অধ্যক্ষ হালিম হুজুরের দু’ভাগ্নে জহুর আলী ও আব্দুল বারি, সহোদও তাজুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামকে তাদেও স্বজনদেও সামনে নির্মমভাবে গুলি কওে হত্যা করে। এছাড়াও পোনরা গ্রামে (নরসিংদী জেলার) মুক্তিযোদ্ধা আবুবকর, ভিড়াল্লা গ্রামের শহীদ মজিবুর রহমানের কবর পথিকের হৃদয় এখনো আলোড়িত করে।

ওই সময় ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের রাজামেহার এলাকায় মাইন বিস্ফোরনে সাত পাকসেনা নিহত হলে ওই এলাকার দু’পাশের প্রায় তিন কিলো মিটার এলাকা জ¦ালিয়ে দেয় শত্রুসেনারা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেবিদ্বার উপজেলার নলআরায় (ফতেহাবাদ গ্রামের একটি গভীর জঙ্গল) এবং ন্যাপ প্রধান এলাহাবাদ গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে দু’টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ওখান থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে চলে যেত।

 

ইতিহাস সংগ্রেহে: এবিএম আতিকুর রহমান বাশার
সভাপতি, দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.