যে দিন প্রথম রোজা রেখেছিলাম-শৈশবের কথা
যে দিন প্রথম রোজা রেখেছিলাম-শৈশবের কথা।।
রোজা মানে আত্মসংযম ও ধৈর্যের শিক্ষা। মনে পড়ে তের বছর বয়সে প্রথমবার সবগুলো রোজা রেখেছিলাম। সে বছরের রমজান ছিল জুন মাসে। এমনিতেই দিন বড়, তার উপর পুরো ত্রিশটি রোজা রাখা সহজ কাজ ছিল না। তবুও সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯৯২ সাল পর্যন্ত আমি গ্রামে ছিলাম। এর আগেই খুলনার “সাপ্তাহিক গ্রামাঞ্চল” পত্রিকার মাধ্যমে বড় ভাই মনির মোল্লার পৃষ্ঠপোষকতায় সাংবাদিকতার হাতে খড়ি হয়। আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে। আমাদের পরিবার ছিল যৌথ পরিবার—দাদা-দাদী, চাচা-চাচী, ভাই-বোন সবাই মিলে বড় পরিবার। দাদা জয়নুল আবেদীন মিয়াজি ছিলেন একজন সম্মানিত ইমাম, তাই পরিবারে ধর্মীয় পরিবেশ ছিল প্রবল।
রোজার সময়ে স্কুলে ক্লাস হতো না। ছুটির আগে দিনটি ছিল বন্ধুদের সঙ্গে গল্পের দিন। প্রায় দশ গ্রামের ছেলে-মেয়েরা এলাহাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ত। এক মাস পড়াশোনার চাপ কম থাকবে ভেবে আনন্দ লাগত। তবে শিক্ষকরা বন্ধকালীন হোম টাস্ক দিয়ে দিতেন। রমজানের ছুটিতে আমরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকতাম। তখন ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়নি, ফুটবলই ছিল প্রধান খেলা।
গ্রামে তখন মাইক ছিল না। সেহরির সময় টিনে আঘাত করে বা টিন দিয়ে তৈরি হর্নে গজল গেয়ে মানুষকে জাগানো হতো। দূরের জুট মিল থেকে সাইরেন বাজত—প্রথম সাইরেনে রান্না, দ্বিতীয়তে সবাইকে ডাকা, তৃতীয় সাইরেনে আযান। ঘড়ির প্রচলন ছিল না বললেই চলে। আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় বোঝার চেষ্টা করতাম।
ইফতারের সময় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজানো হতো। খাবারের মধ্যে থাকত মুড়ি-গুড়, দই-চিড়া, ডালের বড়া, লাল আটার পিঠা। মুরুব্বীরা পান্তা ভাত খেতেন, কেউ লেবুর শরবত পান করতেন। প্রথম রোজার দিন তিনটি ১০ পয়সা দিয়ে আইসক্রিম কিনেছিলাম, কিন্তু ইফতারের আগেই গলে গিয়েছিল।
তখন রেডিমেড কাপড়ের প্রচলন কম ছিল। বাজার থেকে কাপড় কিনে দর্জির দোকানে বানাতে হতো। পুরোনো কাপড় পরিষ্কার করা হতো কলাগাছের ছাই দিয়ে। গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকায় কেরোসিনের কুপি বা চেরাগে আলো জ্বালানো হতো। সন্ধ্যায় গল্পের আসর বসত, কেউ পুঁথি পাঠ করত, কেউ জারি গান গাইত।
টেলিভিশন ছিল মাত্র একটি বাড়িতে। বিশেষ দিনে সেখানে গিয়ে নাটক দেখা ছিল বড় আনন্দের বিষয়। মোবাইল ছিল না; জরুরি প্রয়োজনে টেলিগ্রাম করতে কুমিল্লা যেতে হতো।
মামার বাড়িতে যাওয়া ছিল বড় অভিজ্ঞতা—৪/৫ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হতো। পথের ধারে বটগাছের নিচে বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করতাম। পৌঁছালে আত্মীয়স্বজনের আন্তরিকতা সব কষ্ট ভুলিয়ে দিত।
শৈশবের সেই দিনগুলো আজও মনে পড়ে—স্বল্পতায় ভরা কিন্তু আন্তরিকতায় পূর্ণ এক সময়। সেই জীবন আমাদের ধৈর্য।
লেখক পরিচিতি: মমিনুল ইসলাম মোল্লা, গুগুল কন্ট্রিবিউটর, শিক্ষকও সাংবাদিক, কুমিল্লা ।


No comments