স্মৃতিতে -৯০ দশকের গেঁয়ো শীত//

 স্মৃতিতে -৯০ দশকের গেঁয়ো শীত//

মমিনুল ইসলাম মোল্লা সাংবাদিক কলামিস্ট ও ঐতিহ্য বিষয়ক লেখক কুমিল্লা।।

১. কুয়াশা আবৃত সকাল

নব্বই দশকের শীতের সকাল কুয়াশায় ঢাকা থাকত। মাঠ, ঘাস, গাছ—সবই যেন ধোঁয়ায় ঢাকা। শিশিরভেজা ঘাসে পা রাখলেই ঠান্ডা লাগত, কিন্তু সেই ঠান্ডার মাঝেই গ্রামের জীবনকে প্রাণবন্ত করে তুলত। সূর্যের দেখা বিরল, কখনো এক সপ্তাহ রোদও উঠত না।

২. পিঠা খাওয়ার স্মৃতি

শীতের সকালের অন্যতম আনন্দ ছিল আগুনের পাশে গরম পিঠা খাওয়া। আমরা বড় বড় শুকনো ডালা সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাতাম। বৃদ্ধা মহিলারা মাটির পাত্রে তুষ দিয়ে আগুন জ্বালাতেন, আর সেই তুষের মধ্যে আগুন মিটিমিটি জ্বলতো। আগুনের উষ্ণতা আমাদের হাত ও শরীরকে গরম রাখত।

৩. খেজুরের রস

ভোরে খেজুর গাছে উঠত গাছিরা এবং মাটির হাঁড়িতে রস সংগ্রহ করত। রস ঢালার সময় চারদিকে মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ত। গ্রামের মানুষ ভোরবেলায় সেই রসের জন্য অপেক্ষা করত। তাজা খেজুর রস খাওয়া শীতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।

৪. কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানো

সন্ধ্যা নামলে আমরা বড় বড় গাছ থেকে শুকনো ডালা ভেঙে আগুন জ্বালাতাম। আগুনের পাশে বসে গল্প করা, হাসি-ঠাট্টা করা—সব মিলিয়ে শীতকে রোমাঞ্চকর করে তুলত।

৫. হারিকেনের আলো

বিকেলবেলা আমরা হারিকেনের চিমনি মুছে রাখতাম। রাতে হারিকেনের আলো দিয়ে পড়াশোনা করতাম। ছোট আলো হলেও আমাদের পড়াশোনার উৎসাহকে আরও উজ্জ্বল করত।

৬. পূর্ণিমার রাত ও জোনাকি পোকা

শীতের পূর্ণিমার রাতে আমরা পুকুর পাড়ে জোনাকি পোকা ধরতাম। সেগুলো ঘরে এনে মশারির ভিতর ছেড়ে দিতাম। মিটিমিটি আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়ত এবং রাতকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলত।

৭. খেলাধুলার আনন্দ

শীত মানেই খেলাধুলার আনন্দ। মামিন আর তার বড় ভাই মনির, এলাহাবাদ গ্রামের দুই চঞ্চল ছেলে, কুয়াশায় মাঠে খেলত লুডু, ঘুটি, কাবাডি, লাটিম, ভলিবল, ডাংগুলি, দাড়িয়াবান্দা ও গোল্লাছুট। তাদের হাসি-চিৎকার শীতের সকালকে প্রাণবন্ত করত। মা প্রায়ই বকাঝকা করতেন—“ঠান্ডা লাগবে, পড়াশোনা করো।” বাবা কঠোর, পড়াশোনায় মন না দিলে ঘরে জায়গা দিতেন না, তবে কাকার সুপারিশে আবার ঘরে জায়গা পেত।

৮. স্কুল জীবন

আমি তখন এলাহাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তাম, রোল নং ১। স্কুলে যাওয়ার আগে আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে হাত গরম করা এবং পিঠা খাওয়া ছিল শীতকালীন রোমাঞ্চের অংশ।

৯. শীতের আনন্দ ও সরলতা

শীতের কষ্ট থাকা সত্ত্বেও গ্রামের মানুষ একে অপরকে সাহায্য করত। আগুনের উষ্ণতা, খেজুর রসের মিষ্টি সুবাস, শিশুদের খেলাধুলা—সব মিলিয়ে নব্বই দশকের শীতের সকাল আজও মনে প্রাণে উজ্জ্বল। সেই সরলতা, ঠান্ডার কষ্ট, রোমাঞ্চ এবং আনন্দ এক অমূল্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল।

লেখক পরিচিতি -মমিনুল ইসলাম মোল্লা সাংবাদিক কলামিস্ট ও ঐতিহ্য বিষয়ক লেখক কুমিল্লা।।

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.