বিশ্বের একমাত্র মহিলা নবাব : ফয়জুন্নেসা


 

বিশ্বের একমাত্র মহিলা নবাব : ফয়জুন্নেসা


মমিনুল ইসলাম মোল্লা,সাংবাদিক,কলামিস্ট,কুমিল্লা।।

লার ইতিহাসে নারীর শিক্ষা ও জাগরণের ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়ার নাম সর্বাধিক পরিচিত। কিন্তু তারও অর্ধশতাব্দী আগে এক মহীয়সী নারী উপমহাদেশকে বিস্মিত করেছিলেন—তিনি কুমিল্লার পশ্চিমগাঁওয়ের কন্যা নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। ১৮৩৪ সালে জন্ম নেওয়া এই মানবতাবাদী নারী সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য ও জনকল্যাণে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ও একমাত্র মহিলা নবাব।

ফয়জুন্নেসার পূর্বপুরুষরা দিল্লির অভিজাত পরিবারভুক্ত। তার পিতা মৌলভী আহমদ আলী ছিলেন একজন স্বনামধন্য আলেম। এমন পরিবারে বেড়ে ওঠা এই প্রতিভাবান নারী প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন মাওলানা তাজউদ্দিন আহমদের নিকট। শৈশবেই তিনি আরবি, ফারসি, বাংলা, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ ও সংগ্রামের মধ্যেও তিনি বিদ্যাবুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় অন্যদের থেকে ছিলেন আলাদা।

১৮৮৫ সালে পরিবারের সম্মতিতে তিনি বিরাট জমিদারির দায়িত্ব নেন। পর্দার অন্তরালে থেকেও ন্যায়-নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি জমিদারি পরিচালনা করেন। তার দানশীলতা ও মানবতাবোধ ছিল অসাধারণ। কুমিল্লার জনহিতকর কাজে আর্থিক সহায়তা প্রদানকালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৮৮৯ সালে রানী ভিক্টোরিয়া তাকে "নবাব" উপাধিতে ভূষিত করেন—যা কোনো মুসলিম বাঙালি নারী এর আগে পাননি।

শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান সবচেয়ে অনন্য। ১৮৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেগম ফয়জুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, যা আলীগড়ে মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের দুই বছর আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০ বছর পর তিনি স্থাপন করেন মহিলাদের জন্য জানানা হাসপাতাল। পাশাপাশি মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য বিপুল সম্পত্তি ওয়াকফ করেন।

সাহিত্যেও তিনি রেখেছেন কৃতিত্বের ছাপ। ১৮৭৬ সালে তার আত্মজৈবনিক কাব্যগ্রন্থ রূপজালাল প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি নিখুঁতভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সমাজবাস্তবতা তুলে ধরেন। এ গ্রন্থ তাকে উপমহাদেশের প্রথম সারির নারী কবিদের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৮৯৪ সালে পবিত্র হজ পালনের সময় তিনি মক্কায় দান করেন এবং একটি মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও বিদ্যমান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই কন্যার জননী ছিলেন। নানা দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও তিনি নারীশক্তির জাগরণ ও সমাজ সংস্কারে আজীবন কাজ করে গেছেন।

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ সালে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তবুও তার কর্মকাণ্ড আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। নবাব ফয়জুন্নেসা আমাদের শিখিয়েছেন, নারীও পারে সমাজকে আলোকিত করতে, কুসংস্কার ভাঙতে ও নতুন প্রজন্মকে শক্তির পথে এগিয়ে নিতে।

আজ প্রয়োজন তার জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগে যদি তার কর্মযজ্ঞকে যথাযথভাবে প্রচার করা যায়, তবে নারীশিক্ষা ও সমাজকল্যাণে তিনি হয়ে উঠবেন এক অনন্ত প্রেরণার বাতিঘর।

লেখক পরিচিতি: মমিনুল ইসলাম মোল্লা,সাংবাদিক,কলামিস্ট,কুমিল্লা।।

No comments

Theme images by mammuth. Powered by Blogger.