রাসূল (ﷺ)-এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠের বিধান
রাসূল (ﷺ)-এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠের বিধান
যেকোনো মাজলিসে, মাহফিলে, আসরে, যেখানেই দু’এক জন মুসলিম একত্রিত হবেন, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত মাঝে মাঝে কিছু দরুদ পাঠ করা। অন্তত আলোচনা বা মাজলিস ভাঙ্গার আগেই ২/১ বার আল্লাহ যিকর ও দরুদ পাঠ না করা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। এছাড়া সদা সর্বদা ও সর্ববস্থায় যত বেশি সম্ভব দরুদ ও সালাম পাঠ করা সুন্নাতের নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর নাম লিখার সময় পরিপূর্ণভাবে দরুদ ও সালাম লিখতে হবে। অনেকে কৃপণতা করে শুধুমাত্র ‘(দ:)’ বা ‘(স:)’ লিখেন। এভাবে লিখা উচিত নয়।
Rasuler hoq রাসূল (ﷺ)-এর উপর দরুদ ও সালাম পেশ করা তাঁর সেই হকের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর উম্মতের জন্য অনুমোদন করেছে। আল্লাহ বলেন:‘আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা তাঁর প্রতি দরুদ প্রেরণ কর এবং তাঁকে যথাযথ সালাম জানাও।(সুরা আহযাব ৫৬)
Aiater bakha ’বলা হয়েছে যে, নবী (ﷺ)-এর উপর আল্লাহর স্বলাত ও দরূদের অর্থ হল ফেরেশতাদের নিকট তাঁর প্রশংসা করা। আর ফেরেশতাদের স্বলাতের অর্থ দুআ এবং মানুষের স্বলাতের অর্থ ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা’ এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে তাঁর সর্বোচ্চ দপ্তরে তাঁর বান্দা ও নবীর মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তিনি নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেশতাদের কাছে তাঁর প্রশংসা করেন। ফেরেশতাগণ ও তাঁর প্রতি দরুদ পেশ করেন। রাসূল (ﷺ)-এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠের হুকুম এমন স্থানসমূহে এসেছে - যদ্বারা একথাই সাব্যস্ত হয় যে, তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠ হওয়া ওয়াজিব, নয়তো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
azan dorod আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু
থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসুল (ﷺ) কে বলতে শুনেছেন, “তোমরা যখন মু‘আযযিনকে আযান দিতে শুনবে, তখন সে যা বলে তাই বলবে। তারপর আমার
ওপর দুরূদ পাঠ করবে। কারণ যে আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার
ওপর দশবার রহমত নাযিল করেন। পরে আল্লাহর কাছে আমার জন্য ওসীলার দু‘আ করবে। ওসীলা হল জান্নাতের একটি বিশেষ স্হান, যা আল্লাহর বান্দাদের
মধ্যে কোন এক বান্দাকে দেয়া হবে। আমি আশাকরি যে, আমিই হব সেই বান্দা। যে আমার জন্য
ওসীলার দুআ করবে, তার জন্য আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে যাবে।” [মুসলিম, হাদীস নং ৩৮৪।]ইবনুল কাইয়েম র. তার جلاء الأفهام কিতাবে এরূপ একচল্লিশটি স্থান উল্লেখ করেছেন। এ স্থানগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা তিনি এভাবে শুরু করেছেন।
Salam “আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি আমাকে সালাম করে তখন আল্লাহ তা‘আলা আমার রূহ ফিরিয়ে দেন এবং আমি তার সালামের উত্তর দেই।” [আবুদাউদ, হাদিস: ৬ (হাসান)]✔ Shohi dorod -দরূদ শরীফের মাসনূন শব্দসমূহ-আমাদের দেশে নবী (ﷺ) এর উপর দরূদ পড়ার বিভিন্ন শব্দ পাওয়া যার অধিকাংশই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত বা স্বীকৃত কোনো দরূদ নয়। এগুলো সবই মনগড়া, বানানো ও জাল হাদিসের বৃত্তিতে আমাদের কাছে পৌছেছে। সহিহ দরুদগুলো হলোঃ✔ (১) ‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আযওয়াজিহী ওয়া যুররিয়্যাতিহী কামা ছাল্লাইতা ‘আলা আলি ইবরাহীমা, ওয়া বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আযওয়াজিহী ওয়া যুররিয়্যাতিহী কামা বারাকতা ‘আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ’। [বুখারী, হাদিস: ৩৩৬৯]
✔ (২)‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লাইতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া ‘আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ। ‘আল্লাহুম্মা বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা কারাকতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া ‘আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ।
✔ (৩)‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিনিন্নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লাইতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া ‘আলা আলি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ। [ইসমাঈল কাযী, হাদিস: ৫৯ (হাসান)]
✔ ৪ ‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লাইতা ‘আলা আলি ইবরাহীমা, ওয়া বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা ‘আলা আলি ইবরাহীমা ফিল আলামীনা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ’। [মুসলিম, হাদিস: ৪০৫।]
✔ (৫) ‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিন আব্দিকা ওয়া রাসুলিকা, কামা ছাল্লাইতা ‘আলা আলি ইবরাহীমা, ওয়া বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা ‘আলা ইবরাহীমা’। [বুখারী, হাদিস: Salam✔ রাসূল (ﷺ)এর উপর সালাম পাঠ করা
নবী (ﷺ)এর উপর সালাম প্রেরণের জন্য মাসনূন শব্দ হল নিম্নরূপ।“আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী (ﷺ) আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন: আল্লাহই হলেন ‘সালাম’। অতএব তোমরা যখন স্বলাত আদায় করবে তখন বলবে-‘আতাতহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াচ্ছালাওয়াতু ওয়াত্ত্বাইয়িবাতু আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান্নাবিইয়ু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আসসালামু ‘আলাইনা ওয়া ‘আলা ইবাদিল্লাহিচ্ছালিহীন’ -এরূপ বললে আসমান ও জমিনের প্রত্যেক নেককার ব্যক্তি তা প্রাপ্ত হবে। তারপর বলবে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু’। [বুখারী, হাদিস: ৮৩১]
Bibid এ স্থান গুলোর মধ্যে তিনি আরো উল্লেখ করেন কুনুতের শেষে, খুতবাসমূহে যেমন জুময়ার খুতবায়, ঈদের খুতবায়, ইস্তেসকার খুতবায়, মুয়াযযিনের জবাব দেয়ার পর, দুআর সময়, মসজিদে প্রবেশের সময়, এবং মসজিদ থেকে বের হবার সময়, নবী (ﷺ)-এর নাম উল্লেখ করা হয়।
Opkarita একবার দরুদ পাঠে আল্লাহ দশ বার রহমত বর্ষণ করেন, দুআর শুরুতে দরুদ পাঠ করলে দুআ কবুল হওয়ার আশা করা যায়, দরুদ পাঠের সাথে যদি রাসূল (ﷺ)-এর জন্য ‘‘অসীলা’’ তথা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান এর প্রার্থনা করা হয় তাহলে তা তাঁর শাফায়াত লাভের কারণ, দরুদ পাঠ গুনাহ মাফের কারণ এবং নবী করীম (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে জবাব দেয়ারও কারণ।এ মহান নবীর উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।
Poddoti ✔ দরুদ সালামের সুন্নাত-পদ্ধতিসমূহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণের সুন্নাত হলো সদা সর্বদা আল্লাহর যিকর ও দরুদ সালাম আদায় করা। এমনকি নাপাক অবস্থায় বা গোসল ফরয থাক অবস্থায়ও তাঁরা আল্লাহর যিকর, দোয়া ও দরুদ পাঠ করতেন। এক্ষেত্রে তাঁরা কোনো বিশেষ পদ্ধতি বা নিয়ম নির্ধারণ করেননি। বসে থাকলে বসে বসে, দাঁড়িয়ে থাকলে দাঁড়িয়ে, শুয়ে থাকলে শুয়ে তাঁর স্বলাত ও সালামের ইবাদত আদায় করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁদের সুন্নাতের বিশেষ দিক হলো তাঁরা সর্বদা ব্যক্তিগতভাবে স্বলাত ও সালাম আদায় করতেন।
Salam powsano হযরত আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি
রাসূল (ﷺ)-কে
বলতে শুনেছি—তিবিলছেন, তোমরা আমার রওজাকে
ঈদগাহ বানিয়ো না, আমার উদ্দেশ্যে দরুদ পাঠ কর, তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের দরুদ আমার
কাছে পৌঁছে।রাসূল যখন দেখতে পেলেন যে, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের মহান ব্যক্তিদের কবরকে
বা সরিক উৎসব স্থল বানিয়ে নিয়েছে, এমনকি তারা তাদের কাছে নিজেদের ইচ্ছাগুলো পেশ করছে,
মান্যত করছে, তাদেরকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করছে—তখন তিনি নিজের উম্মতকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা আমার রওজাকে
ঈদগাহ বানিয়ো না, মানুষ যেভাবে প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি দিনে উত্তম পোশাক পরিধান করে
আনন্দচিত্তে ঈদগাহে গমন করে, আমার রওজার সাথেও তেমন আচরণ করো না। সওয়াবে আকাঙ্খা হলে
তোমরা আমার উদ্দেশ্যে দরুদ পাঠ কর, এতে আমার ও তোমাদের সম্মিলিতভাবে উভয়ের সওয়াব লাভ
হবে। দরুদ পাঠের জন্য কবরের পাশে আগমন জরুরী নয় ; আপন আপন স্থানে থেকে যদি আমার উদ্দেশ্যে
দরুদ পাঠ কর, আল্লাহ তাআলা তা আমার কাছে পৌঁছে দিবেন। কারণ, আল্লাহ পাক দরুদ প্রেরণের
জন্য ফেরেশতা নিয়োগ করে রেখেছেন। দরুদ হল আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা জানান যে, হে
আল্লাহ ! আপনি মোহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।
আল্লাহ পাক যে কোন স্থান হতে বান্দার ডাক শুনেন।অর্থঃ তোমাদের জন্য আবশ্যক আমার ও আমার পরবর্তী হেদায়াত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরা যেভাবে দাঁত দিয়ে কোন জিনিস দৃঢ়ভাবে কামড়ে ধরা হয়। আর শরীয়তে নিত্য নতুন জিনিস আবিস্কার করা হতে বেঁচে থাক। কেননা সকল নবসৃষ্ট বস্তুই বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।
**মমিনুল
ইসলাম মোল্লা,লেখক, কলামিস্ট ও প্রভাষক ।

No comments